বাল্যবিবাহকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে তালেবান? নতুন আইন ঘিরে তীব্র উদ্বেগ

আফগানিস্তান (Afghanistan)-এর তালেবান সরকার নতুন একটি আইনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কার্যত বাল্যবিবাহকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার পথে এগোচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। শুক্রবার (২২ মে) প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian)-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, নতুন এই আইন মেয়েশিশু ও তরুণীদের জন্য আরও ভয়াবহ বাস্তবতা তৈরি করবে। বিশেষ করে স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিবাহবিচ্ছেদের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাদের ভাষায়, এটি শুধু একটি আইন নয়, বরং নারীদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার পদক্ষেপ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে জোরপূর্বক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ১১ বছর বয়সের পর মেয়েদের শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

একটি বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, তালেবান মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বন্ধ করার পর প্রায় ৭০ শতাংশ মেয়েকে অল্প বয়সে বা জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব বিয়ের মধ্যে ৬৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েদের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে।

তালেবান শাসনে আফগানিস্তানে বাল্যবিবাহের ওপর কার্যত কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। গত সপ্তাহে অনুমোদিত নতুন বিবাহবিচ্ছেদ আইন অনুযায়ী, কোনো নারী যদি পরবর্তীতে দাবি করেন যে তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল, স্বামী আপত্তি জানালে তার বিচ্ছেদের আবেদন গ্রহণ না-ও হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অধিকারকর্মীরা।

আইনের আরও কিছু ধারা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সেখানে ইঙ্গিত রয়েছে, স্বামীর অনুপস্থিতি কিংবা আর্থিক সহায়তা না দেওয়াকে একমাত্র কারণ দেখিয়ে কোনো নারী বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবেন না।

চলতি সপ্তাহে রাজধানী কাবুল (Kabul)-এ নতুন এই আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন নারী অধিকার সংগঠন আইনটিকে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে “প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতা” বলে আখ্যা দিয়েছে।

মানবাধিকারকর্মী ফাতিমা বলেন, “নারীবিরোধী শত শত নির্দেশ জারির পর এখন তালেবান আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামোর মধ্যেই বাল্যবিবাহকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইছে। নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বদলে তারা লজ্জাজনক নারীবিদ্বেষী নির্দেশ জারি ও মানুষের স্বাধীনতা দমনে ব্যস্ত।”

এদিকে জাতিসংঘ সহায়তা মিশন (UNAMA) আইনটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ সংক্রান্ত এই নতুন ডিক্রি আফগান নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকারকে আরও ক্ষয় করবে এবং বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।

ইউএনএএমএর কর্মকর্তা জর্জেট গ্যাগনন বলেন, নতুন আইনটি এমন এক ধারাবাহিকতার অংশ যেখানে আফগান নারী ও মেয়েদের অধিকার ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে আসছে। তার মতে, এটি এমন একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করছে যেখানে নারীরা স্বাধীনতা, সুযোগ ও ন্যায়বিচারের অধিকার থেকে ধীরে ধীরে বঞ্চিত হচ্ছেন।

তবে তালেবান সরকারের এক মুখপাত্র এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তালেবান নিয়ন্ত্রিত ন্যাশনাল রেডিও অ্যান্ড টেলিভিশনকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “যারা ইসলাম ধর্ম ও ইসলামী ব্যবস্থার বিরোধী, তাদের প্রতিবাদে আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত নয়।”

আফগানিস্তান হিউম্যান রাইটস সেন্টার (Afghanistan Human Rights Center)-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটিতে বাল্যবিবাহের অধিকাংশ ভুক্তভোগী গৃহস্থালি সহিংসতা ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন।

চলতি মাসের শুরুতে মধ্য আফগানিস্তানের দায়কুন্দি প্রদেশে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী স্বামীর নির্যাতনে মারা যায়। তার বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, আট মাস আগে মেয়েটির বিয়ে হয় তার চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে। বিয়ের মাত্র দুই মাস পর থেকেই শুরু হয় নির্যাতন। প্রতিবার মারধরের পর স্থানীয় প্রবীণরা হস্তক্ষেপ করে তাকে সংসারে ফিরে যেতে বাধ্য করতেন।

আফগানিস্তান ইন্ডিপেনডেন্ট হিউম্যান রাইটস কমিশনের আবদুল আহাদ ফারজাম বলেন, “তালেবানের নতুন আইন ও তাদের শাসনব্যবস্থা বাল্যবিবাহকে বৈধতা দিচ্ছে, বিয়েতে স্বাধীন সম্মতির নীতিকে সীমিত করছে এবং কিছু ক্ষেত্রে নারীদের সেই অধিকার থেকেও বঞ্চিত করছে।”

তার ভাষায়, এই ব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করছে এবং নারীদের আইনের চোখে অসম ও অধস্তন অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে।