প্রতিবাদের শঙ্কায় ইহুদি সংস্কৃতি মাসের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান স্থগিত, বিতর্কে ব্রিটিশ মিউজিয়াম

লন্ডনে সম্ভাব্য প্রতিবাদের আশঙ্কাকে সামনে রেখে ইহুদি সংস্কৃতি মাস উপলক্ষে আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা অনুষ্ঠান স্থগিত করেছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম (British Museum)। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে যুক্তরাজ্যে নতুন করে নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে বিরোধী মতের জায়গা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা ‘প্রাচীন ইসরাইল ও জুদাহ’ শীর্ষক বক্তৃতাটি পরে অন্য কোনো সময়ে আয়োজন করা হবে। মিউজিয়ামের বিখ্যাত বিপি লেকচার থিয়েটারে নির্ধারিত এই অনুষ্ঠানে বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের প্রধান ড. পল কলিন্স (Dr Paul Collins)-এর। মিউজিয়ামে সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাধ্যমে প্রাচীন ইসরাইল ও জুদাহ রাজ্যের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব তুলে ধরার পরিকল্পনা ছিল তার।

আলোচনায় ব্যাবিলনের হাতে জেরুজালেম (Jerusalem) ধ্বংস থেকে শুরু করে ম্যাকাবিয়ান বিদ্রোহের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাও উঠে আসার কথা ছিল। এটি ছিল যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ‘জিউইশ কালচার মান্থ’-এর অংশ, যার কার্যক্রম আগামী ১৬ জুন পর্যন্ত চলবে।

তবে অনুষ্ঠানের ২৪ ঘণ্টারও কম সময় আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে ব্রিটিশ মিউজিয়াম জানায়, নিবন্ধিত অংশগ্রহণকারীদের একটি ‘উল্লেখযোগ্য অংশ’ অনুষ্ঠানটি ইচ্ছাকৃতভাবে বিঘ্নিত করার পরিকল্পনা করছিল—এমন তথ্য তারা পেয়েছে। এর ফলে অন্য অংশগ্রহণকারীদের স্বাভাবিকভাবে অংশগ্রহণ এবং অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, গণতান্ত্রিক সমাজে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্ব তারা স্বীকার করে। তবে একই সঙ্গে বক্তা, কর্মী ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তাদের দায়িত্ব। আয়োজক এবং নিরাপত্তা অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করেই অনুষ্ঠান স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।

এই সিদ্ধান্তের পর বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কেমি ব্যাডেনক (Kemi Badenoch), ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টির নেতা, বলেন—ইহুদি সংস্কৃতি মাসের উদ্দেশ্য যুক্তরাজ্যে ইহুদি সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো ও উদযাপন করা, কিন্তু এই সিদ্ধান্ত তার উল্টো বার্তা দিচ্ছে।

সরকারকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, সরকার যদি সত্যিই ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলা করতে চায়, তাহলে রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন নিশ্চিত করা উচিত।

বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও বিবিসি উপস্থাপক সাইমন শামা (Simon Schama) বলেন, এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

অন্যদিকে সমালোচনার পাশাপাশি পাল্টা মতও সামনে এসেছে। ‘জিউইশ আর্টিস্টস ফর প্যালেস্টাইন’ সংগঠনটি প্রশ্ন তোলে—এত বিতর্কিত একটি বিষয়ে আলোচনা আয়োজনের উদ্দেশ্যই তো প্রশ্ন এবং বিতর্কের জায়গা তৈরি করা। সংগঠনটির দাবি, ভিন্নমতকে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখানো হলে সেটি ‘প্রো-জায়নিস্ট প্রচারণা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে।

ব্রিটিশ মিউজিয়াম এখনো স্পষ্ট করেনি কোন গোষ্ঠী প্রতিবাদের পরিকল্পনা করছিল। তবে ইহুদি সংবাদমাধ্যম ‘জিউইশ নিউজ’ জানিয়েছে, ‘জিউইশ আর্টিস্টস ফর প্যালেস্টাইন’-এর কয়েকজন সদস্য অনুষ্ঠানে নিবন্ধন করেছিলেন।

এদিকে ব্রিটিশ ইহুদিদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বোর্ড অব ডেপুটিজ অব ব্রিটিশ জিউজ ঘটনাটিকে ‘দুঃখজনক’ বলে উল্লেখ করেছে। সংগঠনটির বক্তব্য, চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড সাংস্কৃতিক আয়োজন থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে রাখতে পারবে না।

সম্প্রতি লন্ডনের পূর্বাঞ্চলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর আক্রমণের শিকার নোভা ফেস্টিভ্যালের অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে আয়োজিত একটি প্রদর্শনীতেও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা গিয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান