ভারত থেকে কথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’ বা ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ পরিচয়ে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই প্রবণতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে ‘পুশ-ইন’-এর অভিযোগ সামনে আসছে। মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নাগরিক পরিচয়, মানবাধিকার, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক।
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal)-এ ২০২৬ সালের ৯ মে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। কথিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার বিষয়ে নতুন প্রশাসনের ঘোষণার পর সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
পরিচয়ের সংকটে বাংলা ভাষাভাষীরা
ভারতের আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্রসহ বিভিন্ন রাজ্যে গত কয়েক বছরে ‘বাংলাদেশি শনাক্তকরণ’ কার্যক্রম জোরদার হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বহু ক্ষেত্রে ভাষা, ধর্ম কিংবা আর্থসামাজিক অবস্থান সন্দেহের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিশেষ করে দরিদ্র বাংলা ভাষাভাষী শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীকে নাগরিকত্ব প্রমাণে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বন্যা, নদীভাঙন ও দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের কারণে বহু পরিবারের পুরোনো নথিপত্র হারিয়ে যাওয়ায় নিজেদের নাগরিকত্বের প্রমাণ উপস্থাপন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এনআরসি (National Register of Citizens) প্রক্রিয়ার সময়ও নথিপত্রগত অসঙ্গতির কারণে বহু মানুষের নাগরিকত্ব প্রশ্নের মুখে পড়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার পরিবর্তে বিতর্কিত ও অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক ব্যক্তিদের সীমান্ত অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে সুযোগ বুঝে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি ডিটেনশন ক্যাম্প বা হোল্ডিং সেন্টারে দীর্ঘদিন আটকে রেখে মানসিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের ভাষ্য, দীর্ঘ বন্দিজীবন এড়ানোর আশায় অনেক মানুষ নিজেদের বাংলাদেশি বলে স্বীকার করতে বাধ্য হন।
সীমান্ত রাজনীতির আড়ালে দালাল অর্থনীতি
সীমান্ত সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, পুশ-ইন প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক নয়; এর সঙ্গে একটি শক্তিশালী দালাল অর্থনীতিও জড়িয়ে আছে। আটকের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, জাল পরিচয়পত্র তৈরি এবং সীমান্ত পারাপারের অবৈধ নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগ বহুদিনের। অনেক ক্ষেত্রে আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়। অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে তাদের সীমান্তে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন সংকটকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক সীমান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলছে।
সীমান্তে আটকে থাকা মানুষের দুর্ভোগ
পুশ-ইনের ঘটনাগুলোর সবচেয়ে মানবিক দিকটি হলো সীমান্তে আটকে পড়া মানুষের জীবনসংগ্রাম। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তের জিরো লাইন, অস্থায়ী ক্যাম্প, সরকারি গেস্ট হাউস এমনকি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আটক ব্যক্তিদের রাখার খবর পাওয়া গেছে। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের অনেকেই দিনের পর দিন অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন।
তারা কোথায় যাবেন, কোন দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন কিংবা তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে—এসব প্রশ্নের কোনো সুস্পষ্ট উত্তর নেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই অনিশ্চয়তাই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় মানসিক যন্ত্রণা।
সীমান্তভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সপ্রাণ (Sopran)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারত থেকে ২ হাজার ৪৩৬ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু মে ও জুন মাসেই ছিল ২ হাজার ২০ জন। একই বছরের মে মাসে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে এ ধরনের একতরফা পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানিয়ে একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করে।
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। নতুন প্রশাসনের ভোটার তালিকা পুনর্মূল্যায়ন উদ্যোগ এবং ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির ঘোষণা সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন জেলায় হোল্ডিং সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ সমালোচকদের মধ্যে আশঙ্কা বাড়িয়েছে। তাদের মতে, এসব পদক্ষেপের প্রভাব বাংলাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর তুলনামূলক বেশি পড়তে পারে এবং সীমান্তমুখী চাপ আরও বৃদ্ধি করতে পারে।
বাংলাদেশের ওপর বাড়তি চাপ
বাংলাদেশ (Bangladesh) ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী সংকট মোকাবিলা করছে। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার কারণে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপ বহন করতে হচ্ছে দেশটিকে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে বিপুলসংখ্যক মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হলে তা প্রশাসনিক ও মানবিক উভয় ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ কারণেই বিজিবি (Border Guard Bangladesh) সীমান্তে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরকারের অবস্থানও পরিষ্কার—দ্বিপাক্ষিক যাচাই-বাছাই এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আবু রুশদ এ আর এম শহিদুল ইসলাম (Abu Rushd A.R.M. Shahidul Islam) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভারত অতীতেও একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং বর্তমান পরিস্থিতিকেও তিনি এক ধরনের ‘প্রেসার ট্যাকটিক্স’ বা চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে দেখেন।
তার মতে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কৌশলগত, বাণিজ্যিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিস্তৃতি ভারতের উদ্বেগের কারণ হতে পারে। ফলে বিভিন্ন উপায়ে বাংলাদেশকে চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও ধারণা করা যায়।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে থাকেন সীমান্তবর্তী দরিদ্র মানুষরা। সাধারণ জনগণকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, বলপ্রয়োগ করে কাউকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তাদের মতে, পুশ-ইন ও পুশ-ব্যাকের মতো ঘটনা শুধু মানবিক সংকটই সৃষ্টি করে না, বরং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, সীমান্তে একতরফা পুশ-ইন কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; বরং এটি একটি মানবিক ও ভূরাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। তিনি পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের জন্য একটি ‘অশনিসংকেত’ হিসেবে বর্ণনা করে আরও সক্রিয় ও কৌশলগত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সরকারের অবস্থান
গত ৬ মে জেলা প্রশাসক সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণার সময় মুসলিমদের বাংলাদেশে পাঠানোর বক্তব্য শোনা গিয়েছিল। তবে সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
তিনি জানান, সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবিকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও তিনি ব্যক্তিগতভাবে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন না।


