বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিদ্যমান ঋণচুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর পরিবর্তে নতুন একটি ঋণ প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
গত ২১ মে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী (Amir Khasru Mahmud Chowdhury)-এর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল এবং আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্ক (Nigel Clarke)-এর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
এরপর ২৭ মে এক বিবৃতিতে আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভ ক্রজনার (Eve Crozner) জানান, বাংলাদেশ সরকার নতুন একটি কর্মসূচির জন্য আইএমএফের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংস্কার কর্মসূচি ও নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে আইএমএফ বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অংশীদার হিসেবে কাজ করে যাবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন কর্মসূচিতে গেলে বর্তমান সরকার সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য তুলনামূলক বেশি সময় পাবে। কারণ পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ এবং নতুন সরকারের নীতিগত অঙ্গীকারগুলোর সঙ্গে সংস্কার কর্মসূচিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। একই সঙ্গে ভর্তুকি হ্রাসসংক্রান্ত যে চাপ বিদ্যমান ছিল, সে বিষয়গুলো নিয়েও নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, চলমান কর্মসূচি থেকে বের হওয়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ভ্যাট সংস্কার, করছাড় কমানো এবং কর প্রশাসনের আধুনিকায়নের মতো শর্ত পূরণে ধীরগতি। পাশাপাশি ব্যাংক খাত সংস্কারেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, মালিকানা কাঠামো ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আইএমএফ অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
গত এপ্রিলে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক শেষে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এখন চলমান কর্মসূচি থেকে সরে এসে নতুন কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা তুলে ধরে আইএমএফকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নতুন ঋণ কর্মসূচির আকার ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে। তবে নতুন কর্মসূচিতেও সংস্কার বাস্তবায়নের বিভিন্ন শর্ত থাকবে। এসব শর্ত নিয়ে আলোচনা করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিকে, অর্থাৎ জুলাই বা আগস্টে ঢাকায় আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল আসতে পারে।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, নতুন ঋণ কর্মসূচিতে গেলেও সংস্কারের বিষয়গুলো এড়ানো যাবে না। তার মতে, দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই রাজস্ব আদায় বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের উন্নয়ন জরুরি।
তিনি আরও বলেন, চলমান ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তির অর্থ ছাড়ের আলোচনা ছিল। নতুন কর্মসূচিতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে। এমনও হতে পারে, আইএমএফ আরও কঠোর শর্ত নিয়ে আলোচনায় আসে।
ড. মুস্তাফিজুর রহমানের মতে, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে সাধারণত রাজস্ব বৃদ্ধি, ভর্তুকি হ্রাস, রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার মতো শর্ত থাকে। নতুন কর্মসূচিতেও এসব বিষয় থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর বিষয়ে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সরকার আরও নমনীয় অবস্থানের চেষ্টা করতে পারে।
উল্লেখ্য, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তা থেকে ২০২২ সালের ২৪ জুলাই বাংলাদেশ আইএমএফের কাছে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ সহায়তা চেয়ে আবেদন করে। পরে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদ সেই প্রস্তাব অনুমোদন করে। পরবর্তীতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস (Muhammad Yunus)-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের জুনে ঋণ কর্মসূচির পরিমাণ ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশ পাঁচ কিস্তিতে মোট ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। অবশিষ্ট ছিল ১৮৬ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের অক্টোবরে আইএমএফের বার্ষিক সভায় ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড়ের বিষয়টি উত্থাপন করা হলেও সে সময় আইএমএফ সম্মতি দেয়নি। নতুন কর্মসূচির উদ্যোগের ফলে এখন বাংলাদেশ ও আইএমএফের সম্পর্ক নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।


