ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বৈদেশিক আয় দেশে আনেন এমন ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির খবর আসছে। আগামী অর্থবছর থেকে তাদের বিদেশি উৎস থেকে অর্জিত আয় বা রেমিট্যান্সের ওপর আর উৎসে কর কাটা হবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর নির্দেশনার পর এ বিষয়ে আয়কর আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে কাজ শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (National Board of Revenue – NBR)।
দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেট বক্তৃতায় আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী (Amir Khasru Mahmud Chowdhury) আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেবেন। তবে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য এই সুবিধা শুধু বৈদেশিক আয় বা রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। দেশে ব্র্যান্ড প্রমোশন, স্পনসরশিপ বা অন্যান্য উৎস থেকে অর্জিত আয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হারে আয়কর দিতে হবে।
বর্তমান আয়কর কাঠামো অনুযায়ী, দেশের ভেতরে অবস্থান করে বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে সেবা কিংবা পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দেশে আনলে সেটিকে রেমিট্যান্স হিসেবে গণ্য করা হতো না। ফলে ব্যাংকগুলো ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ের ওপর ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখত।
অন্যদিকে, বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে যে অর্থ পাঠান, তা রেমিট্যান্স হিসেবে স্বীকৃত হওয়ায় তার ওপর কোনো উৎসে কর আরোপ করা হয় না। দীর্ঘদিন ধরে ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের পক্ষ থেকে দাবি ছিল, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে তাদের আয়ের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা উচিত।
গত ১ জুন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জনপ্রিয় ফেসবুকভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম চিত্ত মিডিয়া (Chitta Media)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর জুয়েল রানার বৈঠক হয়। বৈঠকে তিনি ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ের ওপর ৭.৫ শতাংশ উৎসে কর আরোপের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনেন। বিষয়টি শুনেই প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেন।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দেশে আনা বৈদেশিক আয়ের ওপর উৎসে কর প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী বাজেটে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে। পাশাপাশি আয়কর আইনে ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ নামে একটি পৃথক সংজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
তবে দেশে পরিচালিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম, ব্র্যান্ড প্রচারণা বা স্পনসরশিপ থেকে আয় করা অর্থের ক্ষেত্রে সাধারণ করদাতাদের মতোই আয়কর পরিশোধ করতে হবে বলে জানা গেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই সিদ্ধান্ত দেশের আইটি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং ফ্রিল্যান্সিং খাতের জন্য ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি বৈদেশিক আয় থেকে ৭.৫ শতাংশ কর কর্তনের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা দেখা যায়। অনেকেই এটিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারীদের জন্য নিরুৎসাহমূলক ব্যবস্থা বলে মন্তব্য করেছিলেন।
বর্তমানে যারা ইউটিউব অ্যাডসেন্স, ফেসবুক মনিটাইজেশন, ডিজিটাল সেবা, অনলাইন মার্কেটপ্লেস কিংবা আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের জন্য কাজ করে আয় করেন, তারা এই সিদ্ধান্তের সরাসরি সুফল পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। একইভাবে তথ্যবহুল, শিক্ষামূলক কিংবা বিনোদনমূলক কনটেন্ট তৈরি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও এর আওতায় আসবেন।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারেও তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সংশ্লিষ্ট খাতে দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন খাতে আরও আট লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, ই-ওয়ালেট চালু, ১০ বছরের কর সুবিধা, ভর্তুকিযুক্ত ঋণ এবং স্টার্টআপ তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
এরই মধ্যে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক (Dutch-Bangla Bank)-ও তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ওপর উৎসে কর কর্তন স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। ব্যাংকটি জানিয়েছে, যেসব ফ্রিল্যান্সারের হিসাব থেকে ইতোমধ্যে কর কেটে রাখা হয়েছে, সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছে।
সম্প্রতি সরকার জনস্বার্থ বিবেচনায় আরও কয়েকটি কর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এনেছে। নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা সংক্রান্ত কর, সম্পদ কর এবং উত্তরাধিকার কর আরোপের উদ্যোগও বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া রপ্তানি প্রণোদনার ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে তা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং আবগারি শুল্কের সীমা তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
