সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যঙ্গ, ক্ষোভ আর তরুণদের হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি এবার প্রথমবারের মতো ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথে নামল। শনিবার রাজধানীর জন্তর মন্তরে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠেন অংশগ্রহণকারীরা। আর এই স্লোগান ঘিরেই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে ভারতে।
প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করেও রাজধানীর বিক্ষোভস্থলে তরুণদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। কেউ তেলাপোকার মুখোশ পরে, কেউ ফুল হাতে, কেউ বই নিয়ে অংশ নেন কর্মসূচিতে। সমাবেশের নেতৃত্ব দেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরা অভিজিৎ দিপকে (Abhijit Dipke), যিনি রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ এবং বোস্টন ইউনিভার্সিটি (Boston University)-এর শিক্ষার্থী।
গত ১৬ মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ককরোচ আন্দোলন’-এর সূচনা করেন অভিজিৎ। এর পেছনে রয়েছে একটি বিতর্কিত মন্তব্য। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত (Surya Kant) আদালতে শুনানির সময় বেকার তরুণদের ‘পরজীবী’ এবং ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। সেই ক্ষোভ থেকেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির জন্ম।
শুরু থেকেই এই সংগঠনকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)-এর নেতারা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু (Kiren Rijiju) অভিযোগ করেন, দলটির প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ অনুসারীর বড় অংশ পাকিস্তান ও তথাকথিত ‘ভারতবিরোধী গ্যাং’ থেকে এসেছে। যদিও দিপকে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন।
বিক্ষোভে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানকে উস্কানিমূলক আখ্যা দিয়ে বিজেপি নেতারা সমালোচনা শুরু করেছেন। তবে সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে অভিজিৎ দাবি করেন, ভারতে সরকারবিরোধী মত প্রকাশের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, দেশে ফেরার আগে তার মা আশঙ্কা করেছিলেন, রাজনৈতিক মত প্রকাশের কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। শুধু তার পরিবার নয়, এমন উদ্বেগ বহু ভারতীয় পরিবারের মধ্যেই রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)-র সরকার এবং বিজেপি বরাবরের মতো এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, সরকার সংবিধান ও আইনের মধ্যেই কাজ করছে।
বিক্ষোভ চলাকালে উত্তেজনাও তৈরি হয়। অভিযোগ উঠেছে, বিজেপি-সমর্থক কিছু ব্যক্তি সমাবেশে ঢুকে সিজেপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে স্লোগান দেন। ‘দিল্লি পুলিশ লাঠি চালাও, আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি’—এমন স্লোগানও শোনা যায়। জন্তর মন্তরের সমাবেশস্থলে প্রবেশের চেষ্টা করলে কয়েকজনকে আটক করে দিল্লি পুলিশ।
এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের বাসভবনের বাইরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম জেন জেড জনগোষ্ঠীগুলোর একটি নিয়ে গঠিত ভারতের তরুণ সমাজে এই নতুন রাজনৈতিক ব্যঙ্গ-আন্দোলন কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো রনজয় সেন বলেন, শুধুমাত্র অনলাইন জনপ্রিয়তা দিয়ে ভারতে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা কঠিন। তার মতে, ভারতের মতো বিশাল ও জটিল দেশে মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক শক্তি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করা সম্ভব নয়।


