জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করতে গিয়ে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ওপর শুল্ককর ও কর কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী (Amir Khasru Mahmud Chowdhury)। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার দিকে উপস্থাপিত এই বাজেট বিএনপি সরকারের বর্তমান মেয়াদের প্রথম বাজেট। প্রস্তাবিত বাজেটে একদিকে যেমন কিছু পণ্যের ওপর কর ও শুল্ক কমিয়ে মূল্য হ্রাসের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, অন্যদিকে কিছু পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর ফলে মূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
বাজেটে ঘোষিত শুল্ক ও কর–সংক্রান্ত প্রস্তাব কার্যত ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়। সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, কর কমানো পণ্যের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।
দাম বাড়তে পারে যেসব পণ্যের
সিগারেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্য নিম্নস্তরে প্রতি ১০ শলাকায় ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরে ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরে ১৬০ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরে ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে সিগারেটের দাম বাড়বে। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উল্লেখ করে নিকোটিন গ্র্যানুলস ও নিকোটিন পাউচের ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব যানবাহার ব্যবহারে উৎসাহ দিতে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ সিসি ক্ষমতার ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলচালিত আমদানি করা গাড়ির করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১৫৬ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। এতে এসব গাড়ির দাম বাড়তে পারে।
দেশীয় উৎপাদন সুরক্ষার লক্ষ্যে বিদেশি কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। অপ্রক্রিয়াজাত ও প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের ক্ষেত্রে শুল্ক যথাক্রমে ১ ও ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে আমদানি করা কাজুবাদামের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশীয় মৎস্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমদানি করা পাঙাশ মাছের ফিলের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া কম্পোজিট এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার আমদানিতে ভ্যাট আরোপের কারণে বিদেশি গ্যাস সিলিন্ডারের দামও বাড়তে পারে।
বিদেশি মধু, সুপারি, সুগার কনফেকশনারি, কফি, বিভিন্ন প্রস্তুত খাদ্য, লিপ লাইনার, লিপ জেলসহ বেশ কিছু প্রসাধনী পণ্যের শুল্কায়ন মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের আমদানি ব্যয় বাড়বে।
রড উৎপাদনে ব্যবহৃত বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে নির্মাণ খাতে ব্যবহৃত রডের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার, বেসিন, ফোম, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, সাইকেল ও খেলনার দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দাম কমতে পারে যেসব পণ্যের
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও বীজসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে করের হার কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হচ্ছে। তার মতে, এই পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে।
শিশুখাদ্য প্রস্তুতের কাঁচামাল আমদানির শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করায় বাজারে শিশুখাদ্যের দাম কমতে পারে।
জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ ও ধনিয়াসহ বিভিন্ন মসলার ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। একইভাবে খেজুর আমদানির ক্ষেত্রেও ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক তুলে নেওয়া হয়েছে।
সোনার গয়নার ক্ষেত্রে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভ্যাট কাঠামোয়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে, ফলে সোনার গয়নার ওপর করের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভির জন্য বড় ধরনের করছাড় ঘোষণা করা হয়েছে। ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির করভার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের গাড়ির ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানিতেও ছাড় দেওয়া হয়েছে।
ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, প্রিন্টার ও মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব এসেছে। ফলে তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের দাম কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কিডনি রোগীদের জন্য স্বস্তির খবরও রয়েছে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে প্রতিবার ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমতে পারে।
ওষুধ শিল্পের জন্য কাঁচামাল আমদানিতে বিভিন্ন রেয়াত দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ক্যানসারের ওষুধ তৈরির নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে।
সংস্কৃতি ও বিনোদন খাতেও ছাড় দেওয়া হয়েছে। গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিনসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা ও এর যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিদেশি মাংস, প্রাণিখাদ্য, পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) যন্ত্র, সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম, লিপস্টিক, ফেসওয়াশসহ বিভিন্ন পণ্যের দামও কমতে পারে বলে বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে।
