জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনার নাঈম হাসান (Nayeem Hasan)-কে আটক ও হেনস্থার ঘটনার পেছনে ছিল একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা। রাত ১টা ২৮ মিনিটে পাঠানো সেই বার্তায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার নম্বর উল্লেখ করে স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগ করা হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই অল্প সময়ের মধ্যে মাঠে নামে পুলিশ। এরপর একের পর এক সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়াগত ভুলের মধ্য দিয়ে জাতীয় দলের এই ক্রিকেটারকে পৌঁছাতে হয় থানার হাজতে।
ঘটনার তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার দিবাগত রাত ১টা ২৮ মিনিটে একটি বিশেষ সংস্থার খুলশী জোনে কর্মরত সার্জেন্ট পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বার্তাটি পাঠান। পরে সেটি খুলশী থানার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার কাছে ফরওয়ার্ড করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বার্তাটির স্ক্রিনশটও তদন্তের অংশ হিসেবে সংগ্রহ করা হয়েছে।
বার্তায় লেখা ছিল, ‘স্যার, চট্ট মেট্রো-থ-১৩-৫৬২৭ (সিএনজি) করে চট্টগ্রাম এয়ারপোর্ট হতে স্বর্ণ চোরাচালান…।’ সেখানে সিএনজিটির নম্বর উল্লেখ থাকলেও কোথায় স্বর্ণ রয়েছে, কার কাছে রয়েছে, যাত্রীর পরিচয় কী কিংবা তথ্যটি কতটা যাচাই করা—এসব বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য ছিল না।
একটি নম্বরের ভিত্তিতেই শুরু হয় অভিযান। পুলিশ সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশেষ সংস্থার পাঠানো বার্তাটি প্রথমে খুলশী থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই মনিরের কাছে পৌঁছায়। তিনি বিষয়টি মোবাইল টিমে দায়িত্ব পালনকারী এসআই শফিকুল ইসলামকে জানান। তবে নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান (Md. Arifur Rahman)-কে অবহিত করার কথা ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি।
এরপর নগরের লালখানবাজার মোড়ে অবস্থান নেয় পুলিশ। কিছু সময় পর বার্তায় উল্লেখিত নম্বরের সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি সেখানে পৌঁছালে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সিএনজির নম্বর মিলে যাওয়ার পর আর কোনো ধরনের প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করা হয়নি। যাত্রীদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি, তাদের কাছে কোনো সন্দেহজনক বা নিষিদ্ধ বস্তু রয়েছে কি না, সেটিও ঘটনাস্থলে পরীক্ষা করা হয়নি। বরং সিএনজি থামানোর পরপরই নাঈম হাসান ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং পরে তাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যে তথ্যের ভিত্তিতে পুরো অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, পরবর্তী তদন্তে তার কোনো বাস্তব ভিত্তি পাওয়া যায়নি। খুলশী থানার ওসি মো. আরিফুর রহমান জানান, থানায় আনার পর তিনি নাঈম হাসানকে চিনতে পারেন এবং পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
শুধু তাই নয়, পরদিন সকালে নাঈম হাসানের ব্যাগও তল্লাশি করা হয়। কিন্তু সেখানে কোনো স্বর্ণ, চোরাচালানের মালামাল কিংবা অবৈধ কিছু পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (Chattogram Metropolitan Police)-এর উত্তর বিভাগের উপকমিশনার ঘটনাস্থলে এসে প্রাথমিক তদন্ত করেন। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি ও প্রক্রিয়াগত ভুলের প্রমাণ পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট এসআইকে ক্লোজ করা হয়েছে।
ওসি আরিফুর রহমান বলেন, বিশেষ সংস্থার পাঠানো বার্তাটি সেকেন্ড অফিসার মোবাইল টিমকে জানায়। মোবাইল টিমের দায়িত্বে থাকা এসআই শফিকুল ইসলাম সিএনজির নম্বর মিলে যাওয়ার পর আর কোনো ব্যাখ্যা বা যাচাইয়ের সুযোগ না দিয়েই নাঈমকে থানায় নিয়ে আসেন।
পুরো ঘটনাটি এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া, দায়িত্ব বণ্টন এবং মাঠপর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একটি অপর্যাপ্ত ও অসম্পূর্ণ বার্তার ভিত্তিতে কীভাবে একজন জাতীয় ক্রিকেটারকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হলো, সেই বিষয়টিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
