২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা, জাতীয় ফুল শাপলা এবং সুন্দরবনের রাজকীয় রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রতীকী উপস্থিতি দেখা যাবে— এমন ভাবনা একসময় অনেকের কাছেই অলীক কল্পনা মনে হতে পারত। কিন্তু সেই কল্পনাকেই বাস্তবে রূপ দিয়ে নতুন এক ইতিহাসের জন্ম দিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিশ্বখ্যাত ডিজে ও সংগীত পরিচালক সঞ্জয় দেব (Sanjoy Deb)।
কানাডার টরন্টো (Toronto) শহরের বিখ্যাত বিএমও ফিল্ড (BMO Field)-এ অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী আয়োজনে তিনি শুধু নিজের সুরের মুগ্ধতা দিয়েই দর্শকদের মন জয় করেননি, বরং নিজের পোশাকের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরে কোটি কোটি বাঙালির আবেগ স্পর্শ করেছেন।
কানাডা বনাম বসনিয়া-হার্জেগোভিনার উদ্বোধনী ম্যাচ শুরুর ঠিক আগে ফিফার উদ্যোগে নির্মিত নতুন অফিশিয়াল গান ‘সির সির’ পরিবেশনের জন্য মঞ্চে ওঠেন সঞ্জয় দেব। তার সঙ্গে যৌথভাবে পারফর্ম করেন নোরা ফাতেহি (Nora Fatehi) এবং ভেজেড্রিম (Vegedream)। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দর্শকদের সামনে তাদের পরিবেশনা মুহূর্তেই উৎসবের আবহ তৈরি করে।
তবে পুরো আয়োজনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে সঞ্জয় দেবের পরিহিত বিশেষ জ্যাকেটটি। জ্যাকেটের ডান হাতায় অত্যন্ত নিখুঁত ও শৈল্পিক এমব্রয়ডারির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল বাংলাদেশের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় ফুল শাপলা এবং লাল বৃত্তের মাঝে সবুজ পটভূমিতে জাতীয় পতাকার প্রতীক। আন্তর্জাতিক এই মঞ্চে নিজের শিকড়কে এমনভাবে তুলে ধরা ছিল এক অনন্য বার্তা।
সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি আসে পারফরম্যান্সের মাঝখানে। গান পরিবেশনের ফাঁকে ফাঁকে সঞ্জয় বারবার নিজের জ্যাকেটের সেই হাতার দিকে আঙুল তুলে ইঙ্গিত করছিলেন। তার এই নীরব শরীরী ভাষা যেন কোটি দর্শকের সামনে একটাই কথা উচ্চারণ করছিল— ‘এটাই আমার বাংলাদেশ’।
সঞ্জয় দেবের পারিবারিক শিকড় সিলেট (Sylhet) অঞ্চলে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে জন্ম নেওয়া সঞ্জয় প্রায় দুই দশক আগে বাবা সন্তোষ দেব ও মা মিতা দেবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। লস অ্যাঞ্জেলেসে বেড়ে উঠলেও তিনি নিজের জন্মভূমির পরিচয় কখনও আড়াল করেননি। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বকাপের এই মুহূর্তের জন্য খুবই বিশেষ পরিকল্পনা করেছি। কারণ, এমন মুহূর্ত জীবনে বারবার আসে না।’ নিজের পোশাকে বাংলাদেশের প্রতীক ধারণ করে সেই কথারই বাস্তব প্রতিফলন ঘটালেন তিনি।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চ কাঁপানোর পর নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে পারফরম্যান্সের ৬৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করেন সঞ্জয়। অল্প সময়ের সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। ফেসবুক, এক্স ও ইনস্টাগ্রামজুড়ে অসংখ্য নেটিজেন মন্তব্য করতে থাকেন— মাঠের খেলায় বাংলাদেশ অংশ না নিলেও সংস্কৃতির বিশ্বমঞ্চে সঞ্জয় দেব দেশের নামকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন।
মাইকেল বুবল, অ্যালানিস মরিসেট এবং অ্যালিসিয়া কারার মতো বিশ্বখ্যাত তারকাদের উপস্থিতির মধ্যেও সঞ্জয় দেবের দেশপ্রেম, আত্মপরিচয়ের গর্ব এবং ব্যতিক্রমী পরিবেশনা আলাদা করে নজর কাড়ে। অনেকের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বপ্ন দেখা নতুন প্রজন্মের জন্য এই অর্জন শুধু একটি পারফরম্যান্স নয়, বরং সাহস ও আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
