রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (Rooppur Nuclear Power Plant)-এর প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর পরীক্ষামূলক উৎপাদনের প্রস্তুতিকালে কয়েকটি কারিগরি ত্রুটি শনাক্ত করেছে কর্তৃপক্ষ। সিস্টেমে চাপ প্রয়োগের পরপরই এসব সমস্যা ধরা পড়ায় উৎপাদনের প্রাথমিক প্রচেষ্টা বন্ধ রেখে প্লান্ট শাটডাউন করতে হয়েছে।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর প্রতিনিধিসহ একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল রূপপুর সফরে ছিল।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের জানান, গত শুক্রবার রাতে প্রথম ইউনিটের সিস্টেমে চাপ প্রয়োগের পর একটি ছোট ধরনের ত্রুটি শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি বড় কোনো সমস্যা নয় এবং দ্রুত সময়ের মধ্যেই সমাধান সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদী।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, পরীক্ষার সময় প্রকৌশলীরা প্রথম ইউনিটের তিনটি পৃথক স্থানে সামান্য ত্রুটি শনাক্ত করেন। সমস্যাগুলো চিহ্নিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী পরীক্ষা স্থগিত রাখতে এবং প্রয়োজনীয় সমাধান ছাড়া কার্যক্রম পুনরায় শুরু না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ত্রুটির প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, জ্বালানি লোডিং-পরবর্তী পরীক্ষার সময় ইউনিটের কয়েকটি স্থানে ছোট আকারের ছিদ্র বা মাইনর হোল শনাক্ত হয়েছে। তাঁর মতে, বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে বড় না হলেও ক্ষতির পরিমাণ ও এর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই ধরনের একটি ত্রুটি অতীতেও ধরা পড়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka)-এর অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সামান্য কারিগরি ত্রুটি কিংবা নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে প্লান্ট শাটডাউন করা হয়ে থাকে। তাঁর ধারণা, জ্বালানি লোডিং পরীক্ষা বা পরীক্ষামূলক উৎপাদনের প্রস্তুতির সময় এমন কোনো বিষয় শনাক্ত হওয়ায় কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে তিনি এটিকে গুরুতর সংকট হিসেবে দেখছেন না।
রূপপুর সফরে থাকা আইএইএ সদস্যরা জানান, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনা কার্যক্রমে সংস্থাটি মূলত পর্যবেক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার ভূমিকা পালন করে। তবে নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকে।
এর আগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (Ministry of Science and Technology) এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (Bangladesh Atomic Energy Commission)-এর যৌথ উদ্যোগে “নিউক্লিয়ার এনার্জি: স্ট্রাটেজি রিয়েলিটিজ অ্যান্ড বাংলাদেশ পাথ ফরোয়ার্ড” শীর্ষক দুই দিনব্যাপী উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
সেখানে অংশগ্রহণকারীদের সামনে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি, আইএইএ-এর পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তা কাঠামো এবং সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার বিশেষজ্ঞরাও আলোচনায় অংশ নেন।
ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, সংসদ সদস্য ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত ওই আলোচনায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদে অন্যান্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কম হবে।
মন্ত্রী আরও জানান, সরকার ভবিষ্যতে আরও দুটি নতুন ইউনিট বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। তবে সেই সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করবে বর্তমান প্রকল্পের সফল সমাপ্তি ও কার্যকারিতার ওপর।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প কিংবা সুনামির মতো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (NPCBL)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহিদুল হাসান বলেন, ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, এমন ঘটনা দশ লাখে একবার ঘটার মতো বিরল। তারপরও নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে প্রথম ইউনিটে গত ২৮ এপ্রিল জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে কেন্দ্রটি থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া একই বছরের জুন মাসে দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমান সময়সূচি ঠিক থাকলে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বরে রূপপুরের দুটি ইউনিট মিলিয়ে মোট ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।
