বিশ্বকাপ অভিযান দারুণভাবে শুরু করেছে আর্জেন্টিনা (Argentina)। বুধবার (১৭ জুন) সকালে কানসাসের অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা রক্ষার মিশনে উড়ন্ত সূচনা করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। দলের হয়ে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে নতুন ইতিহাসও গড়েছেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি (Lionel Messi)। বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন তিনি।
তবে মাঠের দাপুটে পারফরম্যান্সের আড়ালে ম্যাচের একটি বিতর্কিত মুহূর্ত এখন ফুটবল অঙ্গনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। দ্বিতীয়ার্ধে আলজেরিয়ার সেন্টার-ব্যাক আইসা মান্দিকে করা মেসির একটি ট্যাকল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষক, সমর্থক এবং সাবেক ফুটবলারদের অনেকে।
টেলিভিশন রিপ্লেতে দেখা যায়, বল দখলের লড়াইয়ে মেসির বুটের তলা সরাসরি মান্দির পায়ের পেছনের অংশে আঘাত করে। ঘটনার পরপরই আলজেরিয়ার বেঞ্চ থেকে লাল কার্ডের জোরালো দাবি ওঠে। কিন্তু ম্যাচের রেফারি সিমন মারচিনিয়াক (Szymon Marciniak) ঘটনাটিকে কার্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেননি। শুধু তাই নয়, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) থেকেও তাকে মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি পুনরায় পর্যালোচনার কোনো পরামর্শ দেওয়া হয়নি।
এই সিদ্ধান্তের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকারা কি মাঠে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন?
ম্যাচ-পরবর্তী বিশ্লেষণে ইএসপিএন (ESPN)-এর ফুটবল বিশ্লেষক আলে মোরেনো বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, “লিওনেল মেসির এটা শতভাগ লাল কার্ড ছিল। এই ঘটনা সেই ধারণাকেই আরও জোরালো করে যে বড় খেলোয়াড়রা অনেক সময় বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন।”
মোরেনো আরও বলেন, মেসি যখন হ্যাটট্রিকের খুব কাছাকাছি ছিলেন এবং গোলরক্ষক লুকা জিদান তার একটি শট ঠেকিয়ে দেন, তখন ক্যামেরায় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো (Gianni Infantino)-কে হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় দেখা যায়। তার মতে, এমন দৃশ্য অনেকের মনে পক্ষপাতিত্বের প্রশ্ন আরও উসকে দিতে পারে।
একই আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষক নেদুম ওনুওহাও বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “ধারাভাষ্যেও ঘটনাটি প্রায় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। রিপ্লেতে আমরা দেখেছি ট্যাকলটি যথেষ্ট বিপজ্জনক ছিল, অথচ ধারাভাষ্যে বলা হচ্ছিল—‘মেসিকে প্রেসিং করতে দেখে ভালো লাগছে।’”
বিশেষ করে ভিএআরের ভূমিকা নিয়ে দুই বিশ্লেষকই প্রশ্ন তুলেছেন। মোরেনোর মতে, ভিডিও ফুটেজ দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ছিল এবং রেফারিকে অন্তত মনিটরে ডেকে ঘটনাটি দেখানো উচিত ছিল।
তিনি বলেন, “এটা খারাপ ট্যাকল ছিল। কেউ না কেউ অবশ্যই এটি দেখার কথা। কেন রেফারিকে মনিটরে ডাকা হলো না? আমি মেসিকে ভালোবাসি, কিন্তু এটাকে লাল কার্ডই হওয়া উচিত ছিল।”
ওনুওহার মতে, ম্যাচের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। তার ভাষায়, “খেলোয়াড়টি মাঠে পড়ে থাকার সময় মেসির মুখেও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল তিনি নিজেও বুঝতে পেরেছিলেন যে বিপদে পড়তে পারেন। ভিএআর যদি এটি দেখে বলে সব ঠিক আছে, তাহলে সেটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য।”
বিতর্কের মধ্যেও পারফরম্যান্সের বিচারে মেসি ছিলেন ম্যাচের একক নায়ক। ৩৮ বছর বয়সী এই তারকা দূরপাল্লার দুর্দান্ত এক শটে প্রথম গোল করেন এবং ৭৬তম মিনিটে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলদাতাদের তালিকায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন।
এই হ্যাটট্রিকের ফলে তিনি গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও এগিয়ে গেছেন। সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করা ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে পেছনে ফেলে গোলদাতার তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
রেফারির সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার জন্য বড় স্বস্তিই হয়ে এসেছে। কারণ মেসি যদি লাল কার্ড পেতেন কিংবা পরবর্তী ম্যাচে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তেন, তাহলে শিরোপা ধরে রাখার মিশনে তা বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াতে পারত। এখন কোনো কার্ড ছাড়াই তিনি গ্রুপ পর্বের পরবর্তী ম্যাচগুলোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আর একই সঙ্গে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড ভাঙার দিকেও এগিয়ে যাচ্ছেন।


