বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি হিসেবে আলোচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় এক দশকেরও বেশি সময় তদন্ত শেষে খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। প্রায় দেড়শ পৃষ্ঠার এই অভিযোগপত্রে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান (Dr. Atiur Rahman)-সহ দেশি-বিদেশি ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগপত্রটি সম্প্রতি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠিয়ে আইনি মতামত চাওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, খসড়া অভিযোগপত্রে বাংলাদেশের ১০ জন নাগরিকের নাম রয়েছে। পাশাপাশি ভারত, চীন, শ্রীলঙ্কা, জাপান ও উত্তর কোরিয়ার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় মোট ১০১ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ৩৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার পরে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বাকি ৬৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার এখনো ফেরত আসেনি।
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন (Al Mamun) জানান, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে আইনি পরামর্শ পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগপত্রে ড. আতিউর রহমান ছাড়াও সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, মেজবাউল হক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান, সাবেক মহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামান এবং উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদাসহ আরও কয়েকজন বাংলাদেশির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন আইটি উপদেষ্টা রাকেশ আস্থানা (Rakesh Asthana)-র নাম রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রিজার্ভ চুরির ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর তার নেতৃত্বে পরিচালিত ফরেনসিক অডিটের সময় গুরুত্বপূর্ণ আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। এছাড়া প্রীতম রেড্ডি, সুধীন্দ্র আথ্রেশ, নীলভান্নান এবং মাদুক্কুর আনন্দনের বিরুদ্ধেও হ্যাকিং, অর্থ পাচার ও চুরির অভিযোগ আনা হয়েছে।
খসড়া অভিযোগপত্রে উত্তর কোরিয়ার কুখ্যাত ল্যাজারাস গ্রুপ (Lazarus Group) এবং পার্ক জিন হিয়োকের নামও রয়েছে। একই সঙ্গে চীনের গাও শুহুয়াসহ দুই নাগরিক এবং জাপানের সাসাকি নামের একজন ব্যক্তিকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এ ঘটনায় শ্রীলঙ্কার কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেও দায়ী করা হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, চুরি হওয়া অর্থের একটি অংশ শ্রীলঙ্কার মাধ্যমে স্থানান্তরের চেষ্টা হয়েছিল। অভিযোগপত্রে হেগোডা গামাগে শ্যালিকা পেরেরাসহ দেশটির আট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে সংরক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে জাল সুইফট বার্তার মাধ্যমে ১০১ মিলিয়ন ডলার সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনার ৩৯ দিন পর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করে বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank)। এরপর থেকেই সিআইডি মামলাটির তদন্ত করে আসছে।
গত বছরের ১১ মার্চ সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল (Dr. Asif Nazrul)-এর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির তত্ত্বাবধানে তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্রের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।
কমিটির সদস্য এবং প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব (Foyez Ahmed Tayyab) দাবি করেন, তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে কয়েকজন বাংলাদেশির নাম বাদ দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যালোচনা কমিটি গঠনের পর সব তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
মামলার দীর্ঘ সময়ের তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং বর্তমানে অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান (Raihan Uddin Khan) জানিয়েছেন, তদন্তে প্রায় ৭০ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। তিনি দাবি করেন, তদন্ত চলাকালে বাংলাদেশের কয়েকজন অভিযুক্তের নাম বাদ দেওয়ার জন্য একাধিকবার চাপ দেওয়া হয়েছিল।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বাংলাদেশের অভিযুক্তদের নাম বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে তিনি ও মামলার তদারক কর্মকর্তা এতে সম্মত না হওয়ায় বিরোধের সৃষ্টি হয়।
রায়হান উদ্দিন খান আরও বলেন, দীর্ঘ তদন্তে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে বিপুল তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। ফিলিপাইন, ভারত ও জাপান থেকে প্রাপ্ত নথি, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযুক্তদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
বর্তমানে খসড়া অভিযোগপত্র অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পর্যালোচনাধীন রয়েছে। আইনি মতামত পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এক দশকের বেশি সময় ধরে আলোচিত এই রিজার্ভ চুরির মামলায় পরবর্তী পদক্ষেপ এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।


