বিশ্বকাপের জার্সি কিনতেই ৪৬ হাজার টাকা! কী আছে ফিফার ‘হোস্ট সিটি’ সংস্করণে?

বিশ্বকাপ এলেই প্রিয় দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে ফুটবল উন্মাদনায় মেতে ওঠেন কোটি কোটি সমর্থক। কিন্তু একটি জার্সি কিনতে যদি খরচ করতে হয় প্রায় অর্ধ লাখ টাকা, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে কৌতূহলের জন্ম দেয়। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ (FIFA World Cup) উপলক্ষে বাজারে আনা ফিফার বিশেষ ‘হোস্ট সিটি’ জার্সির দাম এখন সেই আলোচনারই কেন্দ্রবিন্দু।

প্রতিটি জার্সির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৭৫ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৬ হাজার টাকার সমান। গত মে মাসের শুরুতে ফিফা (FIFA) তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বিশ্বকাপের আয়োজক শহরগুলোর জন্য বিশেষ নকশার সীমিত সংস্করণের এসব জার্সি বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করে।

বিশ্বকাপের টিকিট থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্মারক পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে আগেই সমালোচনা ছিল। সেই তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছে ‘হোস্ট সিটি’ জার্সি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ফুটবলপ্রেমী এর মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, একটি জার্সির জন্য এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা সাধারণ সমর্থকদের নাগালের বাইরে।

হোস্ট সিটি জার্সি আসলে কী?

বিশ্বকাপকে স্মরণীয় করে রাখতে ফিফা এই বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। আয়োজক ১৬টি শহরের প্রতিটির জন্য আলাদা ডিজাইনের জার্সি তৈরি করা হয়েছে, যা ওই শহরের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ফুটবল আবেগকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এ কারণেই এসব জার্সিকে ‘হোস্ট সিটি’ জার্সি বলা হচ্ছে।

তবে এগুলো প্রচলিত অর্থে খেলার জার্সি নয়। বরং সংগ্রাহকদের জন্য তৈরি বিশেষ স্মারক। প্রতিটি শহরের জন্য মাত্র ৯৯৯টি করে জার্সি উৎপাদন করা হয়েছে। ফলে এটি একটি সীমিত সংস্করণের সংগ্রহযোগ্য পণ্য হিসেবে বাজারজাত করা হয়েছে।

হিসাব অনুযায়ী, ১৬টি আয়োজক শহরের জন্য মোট জার্সির সংখ্যা ১৫ হাজার ৯৮৪টি। ফিফা যদি সব জার্সি বিক্রি করতে সক্ষম হয়, তাহলে শুধু এই কালেকশন থেকেই তাদের আয় হবে প্রায় ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭০ কোটিরও বেশি টাকার সমান।

ডিজাইনে শহরের নিজস্ব গল্প

প্রতিটি জার্সির নকশা সংশ্লিষ্ট শহরের অফিসিয়াল বিশ্বকাপ পোস্টার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা হয়েছে। জার্সির সামনের অংশে রয়েছে ‘ফুটবল বিশ্বকে একত্র করে’ স্লোগানসংবলিত একটি বিশেষ ব্যাজ। বাঁ হাতায় যুক্ত করা হয়েছে প্রতিটি শহরের নিজস্ব স্লোগান এবং পেছনের অংশে রয়েছে শহরের নাম ও বিশ্বকাপের বড় লোগো।

ফিফার দাবি, এসব জার্সিতে পেশাদার ফুটবলারদের খেলার উপযোগী উন্নতমানের কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে। ঘাম দ্রুত শোষণ ও শরীরকে আরামদায়ক রাখার জন্য বিশেষ প্রযুক্তিও যুক্ত করা হয়েছে।

এছাড়া প্রতিটি জার্সিতে রয়েছে আধুনিক এনএফসি (NFC) প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে জার্সির আসল মালিকানা যাচাই করা যাবে, যা সংগ্রাহকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রিমিয়াম বক্সে কী থাকছে?

এই জার্সির সঙ্গে শুধু পোশাক নয়, দেওয়া হচ্ছে একটি বিশেষ প্রিমিয়াম বক্স সেটও। এর মধ্যে থাকছে মালিকানার সনদপত্র, একটি বিশেষভাবে তৈরি হ্যাঙ্গার এবং সংগ্রাহকদের জন্য প্রস্তুতকৃত একটি বই।

অনেকের মতে, জার্সির সঙ্গে যুক্ত এই অতিরিক্ত উপকরণগুলোই মূলত এর উচ্চমূল্যের অন্যতম কারণ। সমালোচকদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করছেন, একটি হ্যাঙ্গার, সার্টিফিকেট এবং আকর্ষণীয় প্যাকেজিং দিয়ে দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে।

তাহলে দাম কি সত্যিই যৌক্তিক?

সীমিত সংস্করণ, উন্নত প্রযুক্তি, প্রিমিয়াম প্যাকেজিং এবং বিশ্বকাপ স্মারক হিসেবে উপস্থাপনের কারণে ফিফা এই জার্সিকে সাধারণ পোশাকের বাইরে একটি বিশেষ সংগ্রহযোগ্য পণ্য হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে।

তবে ফুটবলপ্রেমীদের বড় একটি অংশের মতে, জার্সির নকশা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি এবং মূল্যও সাধারণ সমর্থকদের নাগালের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ‘হোস্ট সিটি’ জার্সি এখনো সেই মাত্রার জনপ্রিয়তা বা আবেগ তৈরি করতে পারেনি, যা এর মূল্যকে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।

তারপরও বিশ্বকাপের স্মৃতি সংরক্ষণে আগ্রহী সংগ্রাহকদের কাছে এই জার্সি ভবিষ্যতে মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। কারণ কিছু জিনিসের মূল্য শুধু ব্যবহারিক নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ঐতিহাসিক গুরুত্বও বাড়তে থাকে। আর সেই অর্থে এই জার্সিগুলো হয়তো একদিন বিশ্বকাপ ইতিহাসের একেকটি স্মারক হিসেবেই বিবেচিত হবে।