জে-১০সিই যুদ্ধবিমান চুক্তিতে বদলাতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণ, বাড়ছে দিল্লির উদ্বেগ

বাংলাদেশের বিমান বাহিনীকে আধুনিক ও যুগোপযোগী শক্তিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে চীনের তৈরি ২০টি জে-১০সিই (J-10CE) মাল্টিরোল ফাইটার জেট কেনার সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশলগত বাস্তবতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। প্রায় ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে নয়াদিল্লি কেবল একটি সামরিক ক্রয় হিসেবে দেখছে না; বরং ভারতের চারপাশে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতির অংশ হিসেবেই বিবেচনা করছে।

এ বিষয়ে ১৮ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া (Defense Security Asia) বলেছে, এই চুক্তি শুধু বাংলাদেশের বিমান শক্তি বৃদ্ধি করবে না, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতেও নতুন আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) সরকারের পতনের পর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস (Muhammad Yunus)-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুদ্ধবিমান ক্রয়ের আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেয়। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও একই নীতি অনুসরণ করে। ফলে ঢাকা ও বেইজিংয়ের সামরিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর পথে এগিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়ন পরিকল্পনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বহরে থাকা পুরোনো এফ-৭ এবং সীমিত সংখ্যক মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে আধুনিক প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত ছিল। আকাশসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই জে-১০সিইকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তির অর্থ ১০ বছরের সহজ কিস্তিতে পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জাতীয় অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক বড় চাপ ছাড়াই আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে বিমানগুলো বাংলাদেশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু যুদ্ধবিমান নয়, পুরো প্যাকেজের আওতায় লজিস্টিক সহায়তা, পাইলট ও কারিগরি কর্মীদের প্রশিক্ষণ, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নত অস্ত্রব্যবস্থা সরবরাহও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ফলে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর হবে।

ভারতের উদ্বেগের কেন্দ্রে ‘চিকেনস নেক’

বাংলাদেশের এই সামরিক আধুনিকায়ন ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর (Siliguri Corridor), যা ‘চিকেনস নেক’ নামেও পরিচিত, দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের কৌশলগত দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত।

ভারতের সামরিক পরিকল্পনাবিদদের আশঙ্কা, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিমানঘাঁটিতে যদি এই আধুনিক চীনা ফাইটার জেট মোতায়েন করা হয়, তাহলে তা ওই করিডোরের নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান (General Anil Chauhan) এর আগেও চীন, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে সম্ভাব্য কৌশলগত স্বার্থের মিল নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছিলেন।

‘অপারেশন সিন্দুর’ পর নতুন আগ্রহ

জে-১০সিই একটি ৪.৫ প্রজন্মের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান হিসেবে পরিচিত। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সংক্ষিপ্ত আকাশ সংঘাত ‘অপারেশন সিন্দুর’-এ পাকিস্তান বিমান বাহিনীর জে-১০সি ব্যবহারের কার্যকারিতা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়। সেই ঘটনার পর থেকেই এই প্ল্যাটফর্মের প্রতি বিভিন্ন দেশের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

বিমানটি উন্নত অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (AESA) রাডারে সজ্জিত, যা একই সময়ে একাধিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও অনুসরণ করতে পারে। পাশাপাশি শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক জ্যামিং মোকাবিলাতেও এটি কার্যকর বলে দাবি করা হয়। এছাড়া এটি দূরপাল্লার পিএল-১৫ এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল বহন করতে সক্ষম, যা আধুনিক আকাশযুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সুবিধা দিতে পারে। উন্নত ডেটা লিংক এবং আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিমানটি নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধ পরিচালনায়ও সক্ষম।

চীনের প্রভাব বৃদ্ধি, সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা

বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশই দীর্ঘদিন ধরে চীন থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। সাবমেরিন, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং যুদ্ধজাহাজের পর এবার অত্যাধুনিক ফাইটার জেট যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে বেইজিংয়ের প্রভাব আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে শেখ হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আগের উষ্ণতার কিছুটা পরিবর্তন এসেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। ট্রানজিট, বাণিজ্য, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও সম্পর্কের প্রকৃতিতে সতর্কতা ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

তবে ঢাকা এই চুক্তিকে সম্পূর্ণভাবে একটি সার্বভৌম প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখছে। বাংলাদেশের দৃষ্টিতে এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পদক্ষেপ নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ।

দক্ষিণ এশিয়ায় নিরাপত্তা প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং সীমান্ত নিরাপত্তায় পারস্পরিক নির্ভরতা থাকার কারণে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা খুব কম। তবে সম্পর্কের ধরন যে পরিবর্তিত হচ্ছে, সেটি স্পষ্ট। আগের বিশেষ ঘনিষ্ঠতার জায়গায় এখন স্বার্থভিত্তিক, সতর্ক এবং কৌশলগত ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের প্রবণতা বাড়ছে।

২০টি জে-১০সিই ফাইটার জেট সংগ্রহের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করার পাশাপাশি বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের ভূরাজনৈতিক উপস্থিতিকেও আরও দৃশ্যমান করবে। এর প্রভাব শুধু ঢাকা, দিল্লি বা বেইজিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যেও এর প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। ফলে অঞ্চলটি এখন আরও প্রতিযোগিতামূলক এবং কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে।