বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (Bangladesh Khelafat Majlis)-এর আমির মাওলানা মামুনুল হক (Mamunul Haque) বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্ট (Royal Resort)-এর ‘৫০১ নম্বর কক্ষ’ প্রসঙ্গে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেছেন। শনিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি ২০২১ সালের ৩ এপ্রিলের ঘটনাবলি, জান্নাত আরার সঙ্গে তার বিবাহ, পরবর্তী আইনি ও সামাজিক বিতর্ক এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।
স্ট্যাটাসে তিনি দাবি করেন, ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল তিনি তার স্ত্রী জান্নাত আরাকে সঙ্গে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ (Narayanganj)-এর রয়েল রিসোর্টের ৫০১ নম্বর কক্ষে অবস্থান করছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় পুলিশের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, কিছু সাংবাদিক এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর সদস্য সেখানে উপস্থিত হন। রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ ফোন করে তাকে জানায় যে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছে। তিনি বলেন, কক্ষের দরজা খোলার পর একদল লোক জোরপূর্বক ভেতরে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন ডিভাইসের মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার শুরু করে।
তার অভিযোগ, ওই পরিস্থিতিতে তাকে এবং তার স্ত্রীকে নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়। তিনি দাবি করেন, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্ত্রীকে নিরাপদ রাখতে ওয়াশরুমে অবস্থান করান। পরে সেখানে নারী পুলিশ সদস্যরা প্রবেশ করেন এবং ঘটনাস্থল থেকে সম্প্রচার চালানো হয়।
মামুনুল হক বলেন, তখন তিনি ও জান্নাত আরা উভয়েই স্পষ্টভাবে নিজেদের বৈবাহিক সম্পর্কের কথা জানান এবং স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সেখানে অবস্থানের বিষয়টি প্রকাশ করেন। তার ভাষ্যমতে, পরবর্তীতে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাদের পরিচয় যাচাইয়ের উদ্যোগ নেন এবং পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে আশ্বস্ত হন। তবে পরে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের থানায় নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, রিসোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় বিপুল সংখ্যক মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছিল। তার দাবি অনুযায়ী, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরাই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি তখন জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন বলে উল্লেখ করেন।
জান্নাত আরার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে মামুনুল হক বলেন, তিনি আগে তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হাফেজ শহিদুল ইসলামের স্ত্রী ছিলেন। পরবর্তীতে পারিবারিক কারণে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর জান্নাত আরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি নিজের পারিবারিক বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে বিবাহের প্রস্তাব দেন। তার ভাষ্যমতে, জান্নাত আরা সম্মতি দিলে শরিয়াহ অনুযায়ী তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়।
তিনি জানান, বিবাহের পর জান্নাত আরাকে কুরআন শিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানো হয় এবং পরে তিনি বিভিন্ন প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রমেও যুক্ত হন। প্রথমদিকে আত্মীয়ের বাসায় এবং পরে আলাদা বাসায় থেকে জীবনযাপন করতেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিবাহ গোপন রাখার বিষয়ে মামুনুল হক বলেন, উপমহাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় একাধিক বিবাহ প্রায়ই পারিবারিক জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই বিবেচনায় তিনি বিষয়টি কিছু সময়ের জন্য সীমিত পরিসরে রেখেছিলেন। তার দাবি, ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি বিষয়টি জানতেন এবং রয়েল রিসোর্টের ঘটনার দিন পুলিশ কর্মকর্তারাও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য যাচাই করেছিলেন।
রিসোর্টে নিবন্ধনের সময় অন্য একটি নাম ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, পরিচয়পত্রে তার প্রথম স্ত্রীর নাম এবং জান্নাত আরার পরিচয়পত্রে সাবেক স্বামীর নাম থাকায় দুজন আলোচনা করেই সেই তথ্য ব্যবহার করেছিলেন।
রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, তারা কোনো অভিযোগ ছাড়াই ব্যক্তিগত পরিসরে ছিলেন। তার প্রশ্ন, সেই অবস্থায় পুলিশের নেতৃত্বে ব্যক্তিগত কক্ষে প্রবেশ, কল রেকর্ড প্রকাশ এবং ব্যক্তিগত তথ্য প্রচারের বৈধতা কোথায়।
স্ট্যাটাসে তিনি বারবার শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণের অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে তাকে রাজনৈতিক ও আদর্শিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছিল। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে তার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল।
মামুনুল হক আরও বলেন, জান্নাত আরাকে দীর্ঘ সময় বিভিন্ন ধরনের চাপ ও ভীতি প্রদর্শনের মধ্যে রাখা হয়েছিল। আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণের সময়ও নানা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। একইভাবে জান্নাত আরার সাবেক স্বামী ও সন্তানদের মাধ্যমেও তার বিরুদ্ধে অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন।
‘মুতা বিয়ে’ বা চুক্তিভিত্তিক বিবাহের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, তাদের বিবাহ ছিল পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহসম্মত ইসলামী বিবাহ। এ ধরনের অভিযোগকে তিনি রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হিসেবে আখ্যা দেন।
জান্নাত আরার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে তিনি জানান, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। তবে ২০২১ সালের ঘটনার পর কিছু মনোমালিন্য তৈরি হলে আলোচনার মাধ্যমে ২০২৫ সালের মার্চে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিচ্ছেদের আগ পর্যন্ত তার প্রাপ্য অধিকার ও ভরণপোষণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
চরিত্রহননের অভিযোগ তুলে মামুনুল হক বলেন, রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিরোধিতার কারণে অনেকেই ওই ঘটনাকে ব্যবহার করে তাকে আক্রমণের চেষ্টা করেছে। তবে এসব প্রচারণা তাকে তার অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
স্ট্যাটাসের শেষাংশে তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় উদাহরণ টেনে কুৎসা ও অপপ্রচারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে তিনি ‘মুবাহালা’র আহ্বান জানিয়ে বলেন, যারা তার বিরুদ্ধে অভিযোগে অনড়, তারা চাইলে ধর্মীয় শপথভিত্তিক সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারেন।
সবশেষে তিনি দাবি করেন, ‘৫০১’ কোনো ব্যক্তিগত লজ্জার প্রতীক নয়; বরং এটি তার ভাষায় একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ব্যর্থতার স্মারক। যারা এটিকে বিদ্রূপের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেন, তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ‘৫০১’কে তারা নিজেদের বিজয়ের প্রতীক হিসেবেই স্মরণ করবেন।
