পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার (Debiganj Upazila) প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) বাবুল চন্দ্র রায়ের (Babul Chandra Roy) বিরুদ্ধে টিআর-কাবিখা-কাবিটা প্রকল্পে ১৫ শতাংশ ঘু’\ষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ক্যালকুলেটরে হিসাব কষে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও প্রকল্প সভাপতিদের কাছে কথিত ঘু’\ষের টাকা চাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সোমবার ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৪ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বাবুল চন্দ্র রায় তাঁর কার্যালয়ের নিজ কক্ষে ফাইলপত্র নিয়ে বসে আছেন। তাঁর সামনে কয়েকজন ইউপি সদস্য ও বিভিন্ন প্রকল্পের সভাপতি উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে কথোপকথন চললেও পিআইওর সামনে বসে থাকা ব্যক্তিদের চেহারা ভিডিওতে দেখা যায়নি।
কথোপকথনের একপর্যায়ে বাবুল চন্দ্র রায় সামনে থাকা একজনকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘ওই মেম্বার সাহেব, আপনার ৮ টন গম না? ৪০ করে।’ জবাবে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘না স্যার, ৩২ হাজার করে।’
এরপর ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে পিআইও বলেন, ‘তাহলে ৩২ ইন্টু ৮, ২ লাখ ৫৬ হাজার, ইন্টু ১৫ পারসেন্ট যদি দেন, ৩৮ হাজার টাকা আসে।’
হিসাব শুনে সামনে থাকা ব্যক্তি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘এত স্যার! একটু কম করে নেন। ৩৮ হাজার টাকা স্যার, কাজের তো লাভও হয়নি।’
এর জবাবে পিআইও বাবুল চন্দ্র রায় বলেন, ‘মেম্বারদের কোনো দিন লাভ হয় না।’
ওই ব্যক্তি তখন নিজের করা কাজের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘আমার কাজটা আপনি দেখেননি স্যার? কী কাজ করছি।’
পিআইও উত্তর দেন, ‘এটা কোনো দিন শুনছেন মেম্বাররা বলছে আমার লাভ হইছে, আপনারা বলেন। আমি যে এত দিন পিআইওগিরি করতেছি, আমাক কোনো মেম্বার বলে নাই যে আমার লাভ হইছে।’
সামনে থাকা ব্যক্তি তখন কাজের মান ও স্থানীয় চাপের কথা জানিয়ে বলেন, ‘কামের (কাজের) তো চাপ স্যার দলীয়ভাবে, জনগণও চায় কাজ একটু ভালো হোক।’
এ কথা শুনে পিআইও বলেন, ‘আমার কথা আমি বলছি, এখন আপনার কোনো কথা থাকলে বলেন।’
কথোপকথনের এ পর্যায়ে সেখানে থাকা একজন বলে ওঠেন, ‘এই চাচার একটা টিআর আছে।’ সঙ্গে থাকা অপর ব্যক্তি বলেন, ‘স্যার, আমার একটা টিআর আছে সামান্য।’
পিআইও তখন জানতে চান, ‘কত?’
ওই ব্যক্তি জবাব দেন, ‘১ লাখ ৬২ হাজার।’
আবারও ক্যালকুলেটর হাতে নিয়ে হিসাব করে বাবুল চন্দ্র রায় বলেন, ‘তাহলে ১ লাখ ৬২ ইন্টু ১৫ পারসেন্ট, ২৪ হাজার।’
২৪ হাজার টাকার কথা শুনে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘২৪ হাজার স্যার! আমরা তো সাড়ে তিন বছর পরিষদেই আসিনি। কাজ তো আমরা হান্ড্রেড পারসেন্ট করি, স্যার।’
এরপর পিআইও বলেন, ‘শুনেন, আপনাদের আগে পরিষদে আসতে দেয় নাই, এর পর থেকে আপনারাও এখন আসতে দেবেন না, শোধবোধ।’
জবাবে ওই ব্যক্তি প্রশ্ন তোলেন, ‘শোধবোধ কেমনে হইল স্যার? আমরা আছি দেড় বছর, পাঁচ বছর তো আর নয়া করে ফিরে আসবে না, সাড়ে তিন বছর গেছে আর দেড়টা বছর।’
ভিডিওর পরবর্তী অংশেও ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে দুজন ব্যক্তির টিআর প্রকল্প থেকে কত টাকা কমিশন আসবে, তার হিসাব করতে দেখা যায় পিআইও বাবুল চন্দ্র রায়কে।
ঘটনার দিন পিআইওর কার্যালয়ে উপস্থিত থাকা দেবীগঞ্জ উপজেলার একজন ইউপি সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে (Prothom Alo) বলেন, ‘ওই দিন আমরা ৮ থেকে ১০ জন পিআইও অফিসে ছিলাম। কে ভিডিও করেছে, বুঝতে পারিনি। এটা ৬ থেকে ৭ দিন আগের ঘটনা।’
নিজের প্রকল্পের বিষয়ে ওই ইউপি সদস্য বলেন, ‘আমি ১ লাখ ২০ হাজার টাকার একটা কাজ করেছি। পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগেই কাজ শেষ হয়েছে, কিন্তু বিল দেয় না। শুধু ঘুরাচ্ছিলেন। পরে বিল পেয়েছি। আমার কাজ শতভাগ বুঝে নিয়েছেন।’
১৫ শতাংশ টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘ওনাকে ১৫ পারসেন্ট দিলে কোথায় টাকা পাব? তবে কারও কাছে ৫ পারসেন্ট, কারও কাছে ৭ পারসেন্ট নিয়েছেন।’
ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বাবুল চন্দ্র রায়ের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে প্রথম আলো। জবাবে তিনি বলেন, ‘আসলে আমরা অনেক সময় ইউপি সদস্য ও প্রকল্প সভাপতিদের ভ্যাট-আইটি, মিস্ত্রি খরচসহ বিভিন্ন হিসাব করে দিই। অনেক সময় কেউ কেউ কাজ না করেই এখানে এসে ধরনা ধরেন।’
ভিডিওটি কীভাবে ধারণ ও প্রকাশ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কিছু জানেন না দাবি করে পিআইও বলেন, ‘কোন সময় কে কীভাবে যে এমন ভিডিও করে ছেড়ে দিয়েছে, এটা তো আমি অবগত নই। আপনারা আমার বিষয়ে তদন্ত করে দেখেন, আমি কারও কাছে এভাবে ঘু’\ষ চাই কি না।’
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নজরে এসেছে পঞ্চগড় জেলা (Panchagarh District) প্রশাসনের। পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীন (Shukriya Parvin) মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভিডিওটা আমরা দেখেছি। এ বিষয়ে দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) তদন্ত করতে বলেছি। তদন্ত প্রতিবেদন পেলেই সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


