দলের আস্থার সংকট মেনে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ছেন কিয়ার স্টারমার

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদ এবং ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি (Labour Party)-এর নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন স্যার কিয়ার স্টারমার (Sir Keir Starmer)। দলের আইনপ্রণেতাদের আস্থার ঘাটতি স্বীকার করে সোমবার দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক ভাষণে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানান। তবে নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন চালিয়ে যাবেন বলেও নিশ্চিত করেছেন তিনি।

স্টারমার জানিয়েছেন, পদত্যাগের বিষয়টি তিনি ইতোমধ্যে রাজা তৃতীয় চার্লস (King Charles III)-কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছেন। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টিকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি এখনও উপযুক্ত কি না, তা নিয়ে দলের ভেতরে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। পার্লামেন্টারি পার্টির কাছ থেকে এ বিষয়ে নেতিবাচক বার্তা পাওয়ার পর তিনি বিনয়ের সঙ্গে দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তার ভাষায়, দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ক্ষমতা হস্তান্তরের রূপরেখা তুলে ধরে স্টারমার জানান, দলের ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটি বা এনইসিকে নতুন নেতা নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ করতে বলা হবে। আগামী ৯ জুলাই থেকে মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এবং গ্রীষ্মকালীন ছুটির আগেই সেটি সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে সেপ্টেম্বরে পার্লামেন্ট পুনরায় বসার আগেই নতুন নেতা নির্বাচন শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

একইসঙ্গে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, নেতৃত্ব পরিবর্তনের পুরো প্রক্রিয়াকে শান্তিপূর্ণ রাখতে তিনি সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন এবং নির্বাচিত উত্তরসূরিকে নিঃশর্ত সমর্থন দেবেন।

মাত্র দুই বছর আগে দীর্ঘ ১৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে লেবার পার্টিকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছিলেন কিয়ার স্টারমার। ছয় বছর আগে দলের দায়িত্ব নেওয়ার সময়ের পরিস্থিতি স্মরণ করে তিনি বলেন, তখন দলটি রাজনৈতিক, আর্থিক এবং নৈতিক—তিন ক্ষেত্রেই গভীর সংকটে ছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, লেবার পার্টির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রায় শেষ হয়ে গেছে।

তবে তিনি দাবি করেন, দল থেকে ইহুদিবিদ্বেষ দূর করা, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা এবং সাংগঠনিক সংস্কারের মাধ্যমে লেবার পার্টিকে আবার শক্তিশালী অবস্থানে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

বিদায়ী ভাষণে নিজের সরকারের বিভিন্ন সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন স্টারমার। তিনি বলেন, বর্তমানে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি সমমনা দেশগুলোর তুলনায় দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে এবং মানুষের আয় মূল্যস্ফীতির তুলনায় বেশি হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তার দাবি অনুযায়ী, সরকারের মেয়াদকালে গত ১৭ বছরের মধ্যে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকা সবচেয়ে দ্রুত কমানো সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় পাঁচ লাখ শিশুকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা, অবৈধ অনুপ্রবেশ কমানো এবং স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ নিশ্চিত করাও তার সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জন।

স্টারমার আরও বলেন, তার নেতৃত্বে বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাজ্যের হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধার হয়েছে এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে।

ক্ষমতা ছাড়ার পরও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী এই নেতা। তার বিশ্বাস, যুক্তরাজ্য এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রস্তুত এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

রাজনীতির সর্বোচ্চ দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পর পরিবারের প্রতি আরও বেশি সময় দেওয়ার ইচ্ছার কথাও জানান তিনি। জীবনের প্রতিটি কঠিন সময়ে পাশে থাকা স্ত্রী ভিক এবং সন্তানদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে স্টারমার বলেন, এখন তিনি একজন দায়িত্বশীল স্বামী ও বাবা হিসেবে নিজের ভূমিকা আরও গভীরভাবে পালন করতে চান।