নিউইয়র্কের প্রাইমারিতে মামদানি-সমর্থিতদের চমক, দুই দলেই বদলের আভাস

যুক্তরাষ্ট্র (United States)-এর নিউইয়র্কে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সাফল্য পেয়েছেন মেয়র জোহরান মামদানি (Zohran Mamdani)। তার সমর্থন পাওয়া তিন প্রার্থীই নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন বর্তমান কংগ্রেস সদস্যকে পরাজিত করে জাতীয় রাজনীতিতেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।

মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই প্রাথমিক নির্বাচনের ফলাফল ডেমোক্রেটিক পার্টি (Democratic Party)-র অভ্যন্তরে পরিবর্তনের সম্ভাবনা এবং নতুন রাজনৈতিক ধারার উত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দলটির ভেতরে আদর্শগত বিভাজনও ক্রমেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

নিউইয়র্কের ১৩তম কংগ্রেসনাল জেলায় মামদানির সমর্থন পাওয়া ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার বিজয়ী হয়েছেন। সপ্তম কংগ্রেসনাল জেলায় জয় পেয়েছেন ক্লেয়ার ভালদেজ। অন্যদিকে দশম জেলায় মামদানির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ব্র্যাড ল্যান্ডার বর্তমান কংগ্রেস সদস্য ড্যান গোল্ডম্যানকে পরাজিত করেছেন।

এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে নিউইয়র্কের ডেমোক্রেটিক রাজনীতিতে মামদানির প্রভাব আরও দৃশ্যমান হলো। তার সমর্থিত প্রার্থীদের ধারাবাহিক সাফল্য দলটির প্রগতিশীল অংশের সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

বিজয়ী প্রার্থীদের সঙ্গে নির্বাচনী সাফল্য উদযাপনে অংশ নিয়ে মামদানি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন চিন্তা এবং ভিন্নধর্মী নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে। তার বক্তব্যে প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে আনার আহ্বানও প্রতিফলিত হয়েছে।

ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুর প্রভাব

এবারের নির্বাচনে ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। কয়েকজন প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইল-সংক্রান্ত নীতির প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন। তাদের বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান এবং এ বিষয়ে ডেমোক্রেটিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ উঠে এসেছে।

বিজয়ী প্রার্থী ব্র্যাড ল্যান্ডার বলেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে ডেমোক্র্যাটদের আরও স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করা প্রয়োজন। তার এই অবস্থান দলটির ভেতরে পররাষ্ট্রনীতি ও মানবাধিকার নিয়ে চলমান মতপার্থক্যকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

তবে সব আসনে প্রগতিশীল কিংবা বামঘেঁষা প্রার্থীরা সফল হতে পারেননি। নিউইয়র্কের ১২তম কংগ্রেসনাল আসনে দলীয় মূলধারার সমর্থন পাওয়া মাইকা ল্যাশার বিজয়ী হয়েছেন। একইভাবে উটাহর একটি আসনেও একজন মধ্যপন্থি প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন।

ফলে এবারের ফলাফলকে শুধু প্রগতিশীলদের একতরফা উত্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং কোথাও নতুন রাজনৈতিক ধারা শক্তিশালী হয়েছে, আবার কোথাও দলের প্রচলিত ও মধ্যপন্থি অংশ নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। এই মিশ্র ফলই ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ আদর্শগত টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্ট করেছে।

রিপাবলিকান রাজনীতিতেও নতুন প্রশ্ন

অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টি (Republican Party)-র রাজনীতিতেও নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ ক্যারোলিনার গভর্নর নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)-এর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নির্বাচনের শুরুতে ট্রাম্প পাম এভেটকে সমর্থন দিয়েছিলেন। পরে তিনি দুই প্রার্থীর প্রতিই সমর্থনের কথা জানান। তবে শেষ পর্যন্ত অ্যালান উইলসন বড় ব্যবধানে জয়ী হন।

এই ফলাফল রিপাবলিকান ভোটারদের ওপর ট্রাম্পের প্রভাব কতটা কার্যকর রয়েছে, তা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া আরও কয়েকজন গভর্নর প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে, রিপাবলিকান রাজনীতিতে তার সমর্থন আগের মতোই নির্ধারক রয়েছে কি না।

একসময় ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন দলীয় প্রাইমারিতে প্রার্থীদের জন্য বড় রাজনৈতিক সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি ফলাফল সেই ধারণাকে নতুন করে যাচাইয়ের মুখে ফেলেছে।

ট্রাম্পবিরোধীরাও প্রত্যাশিত সাফল্য পাননি

তবে নির্বাচনী ফলাফল কেবল ট্রাম্পের প্রভাব কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়নি। ট্রাম্পবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত কয়েকজন প্রার্থীও প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেননি। বিভিন্ন নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ পিছিয়ে পড়েছেন।

ফলে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ট্রাম্পপন্থি ও ট্রাম্পবিরোধী—কোনো পক্ষই সব ক্ষেত্রে এককভাবে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বরং ভোটারদের সিদ্ধান্তে স্থানীয় বাস্তবতা, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক অবস্থানের ভিন্নতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দুই দলেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের প্রাথমিক নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের ভেতরেই সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে নতুন নেতৃত্ব এবং ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার উত্থান যেমন দৃশ্যমান হচ্ছে, তেমনি রিপাবলিকানদের মধ্যেও ট্রাম্পের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে।

বিশেষ করে নিউইয়র্কে মামদানি-সমর্থিত প্রার্থীদের সাফল্য ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশের জন্য বড় রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে কয়েকটি আসনে মধ্যপন্থিদের জয় দেখিয়েছে, দলটির অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ভারসাম্যের লড়াই এখনও শেষ হয়নি।

রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের সমর্থন সব জায়গায় প্রত্যাশিত ফল এনে দিচ্ছে না, আবার তার বিরোধীরাও ভোটারদের মধ্যে সুস্পষ্ট বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারছেন না। ফলে ২০২৬ সালের নির্বাচন সামনে রেখে দলটির নেতৃত্ব, প্রার্থী বাছাই এবং রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী নির্ধারণের জন্য যে ভোট অনুষ্ঠিত হয়, সেটিই প্রাথমিক নির্বাচন বা প্রাইমারি। এই নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট দলের ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেন, সাধারণ নির্বাচনে তাদের দলের হয়ে কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

বর্তমানে অনুষ্ঠিত এসব প্রাথমিক নির্বাচন ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ। তাই প্রতিটি ফলাফল কেবল স্থানীয় আসনের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং দুই দলের জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

এসআর