বাংলাদেশের অন্যতম ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নিদর্শন শাহজালাল মাজার (Hazrat Shah Jalal Shrine)-এ দান হিসেবে আসা অর্থ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সংরক্ষণের সিদ্ধান্তকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মাজারে আসা অর্থ ও অন্যান্য দানের সুনির্দিষ্ট হিসাব সংরক্ষণ এবং আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে জেলা প্রশাসনের উত্থাপিত প্রশ্নের পর বিষয়টি জনপরিসরে ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে।
শুক্রবার সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম মাজার পরিদর্শনে গিয়ে অভিযোগ করেন, মাজারের আয় থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ কিছু ব্যক্তি নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে ব্যয় করেন এবং এর যথাযথ হিসাব সংরক্ষণ করা হয় না। তবে মাজার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত খাদেমরা এ অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এই বিতর্কের মধ্যেই জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দানের জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি ডেগ বা বড় পাতিল সিলগালা করা হয় এবং নতুন একটি দানবাক্স স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, আগামী এক মাস জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ওয়াকফ এস্টেট ও মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করবে।
ঘটনার পর জেলা প্রশাসকের বদলিও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। যদিও তার বদলির সঙ্গে মাজার-সংক্রান্ত পদক্ষেপের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাঈদা পারভীন (Saeeda Parveen) বিবিসি বাংলাকে জানান, সম্প্রতি একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে এবং এখন থেকে মাজারে দান হিসেবে পাওয়া অর্থ ব্যাংকে জমা রাখা হবে।
দানের অর্থ নিয়ে কেন এত আলোচনা?
মাজারকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পক্ষে ও বিপক্ষে বিভিন্ন মহল থেকে মতামত আসছে। একপক্ষের দাবি, মাজারে আসা বিপুল পরিমাণ দানের অর্থ দীর্ঘদিন ধরে কিছু ব্যক্তি ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। অন্যদিকে খাদেমদের বক্তব্য, এটি তাদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অধিকার এবং বহু শতাব্দী ধরে তারাই মাজারের আয়-ব্যয়ের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
শাহজালাল মাজারে এবারই প্রথম দানের ডেগ ও দানবাক্স খুলে প্রকাশ্যে অর্থ গণনার আয়োজন করে জেলা প্রশাসন। গত ২২ জুন অনুষ্ঠিত গণনায় প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকা, কিছু বিদেশি মুদ্রা এবং স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়।
এর আগে ১৮ জুন দানের জন্য ব্যবহৃত তিনটি বড় ডেগ সিলগালা করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে সেগুলো থেকে অর্থ উত্তোলন করা না যায়। পাশাপাশি একটি নতুন দানবাক্সও স্থাপন করা হয়।
মাত্র চার দিনের ব্যবধানে সাড়ে ১৭ লাখ টাকা পাওয়ার পর মাজারে প্রকৃতপক্ষে কত পরিমাণ অর্থ দান হিসেবে আসে, তা নিয়ে জনমনে নতুন কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
মাজারের খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না (Mufti Raihan Uddin Munna) বলেন, প্রায় সাতশ বছর ধরে তাদের পরিবারসহ শাহজালালের সঙ্গীদের উত্তরসূরিরা মাজারের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দরগাটি কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ নয়; এখানে প্রাপ্ত দান মেহমানদের সেবা ও মাজার পরিচালনার কাজেই ব্যয় করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে পরিচালনা কমিটি, জনপ্রতিনিধি ও খাদেম পরিবারগুলোর সঙ্গে বসে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু সেই উদ্যোগ তারা দেখতে পাচ্ছেন না।
সাতশ বছরের ঐতিহ্য ও খাদেমদের দাবি
মাজারের ইতিহাস নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, প্রায় সাতশ বছর আগে আধ্যাত্মিক সাধক শাহজালাল (Hazrat Shah Jalal) তার সঙ্গীদের নিয়ে সিলেটে আসেন এবং ধর্মপ্রচার শুরু করেন।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, শাহজালাল অবিবাহিত ছিলেন। তবে তার সঙ্গীরা পরিবার নিয়ে সেখানে বসবাস করতেন। সে সময় থেকেই ভক্তরা বিভিন্ন উপঢৌকন ও দান নিয়ে দরগায় আসতেন, যা এসব পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হতো।
পরে এসব পরিবারই দরগার খাদেম বা সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকে। সময়ের সঙ্গে পরিবারগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় ৩০০-তে পৌঁছেছে।
সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য গবেষক আব্দুল করিম বলেন, আশপাশে হোটেল-রেস্তোরাঁ গড়ে ওঠার আগে শত শত বছর ধরে আগত দর্শনার্থীদের দেখাশোনা করতেন খাদেম পরিবারগুলোই। সেই ঐতিহ্য এখনও বহাল রয়েছে।
মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্নার দাবি, মাজারের অর্থ মাজারের প্রয়োজনেই ব্যয় করা হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চৌকিদারদের বেতন, লঙ্গরখানার ব্যয়, রমজানে গণইফতার, বার্ষিক ওরশ, নতুন ভবন নির্মাণ, চারতলা মসজিদ নির্মাণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতনসহ সব ধরনের ব্যয় এই তহবিল থেকেই মেটানো হয়।
আব্দুল করিম জানান, প্রচলিত নিয়মে খাদেম পরিবারগুলো পালাক্রমে একেক দিন মাজার পরিচালনা করে। বর্তমানে প্রায় ৩০০ পরিবার রয়েছে। একটি পরিবার বছরে একদিন দায়িত্ব পালন করে এবং সেদিনের আয়ের একটি অংশ মাজার অফিসে জমা দেয়, বাকিটা তারা গ্রহণ করে। তার মতে, এটি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একটি স্বীকৃত অধিকার।
তবে একই সময়ে সরকার ও সিটি কর্পোরেশনও বিভিন্ন সময়ে মাজার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ এবং অর্থ ব্যয় করে থাকে।
অন্য মাজারগুলোর অর্থ কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়?
বাংলাদেশে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দানবাক্সে পাওয়া বিপুল অর্থ প্রায়ই সংবাদ শিরোনাম হয়। সেখানে দানের অর্থের তত্ত্বাবধান করে জেলা প্রশাসন।
অন্যদিকে দেশের অনেক মাজারে বিপুল দান এলেও সেগুলোর অর্থ ব্যবস্থাপনা মূলত মাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা পরিচালনা কমিটির হাতেই থাকে।
ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মাজার, মসজিদ, কবরস্থান ও ঈদগাহগুলোকে ওয়াকফ হিসেবে নিবন্ধনের জন্য গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। তবে বাস্তবে বহু মাজার ওয়াকফ সম্পত্তি হলেও সেখানে প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপ তুলনামূলক কম।
শাহপরাণ মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও এখনো কোনো নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি। স্থানীয়দের মতে, মাজারটি ওয়াকফ এস্টেট হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
বাগেরহাটের খান জাহান আলী মাজারের খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, সেখানে একটি পরিচালনা কমিটি রয়েছে এবং এর বাইরে তিনি কিছু বলতে চান না। উল্লেখ্য, স্থানীয় জেলা প্রশাসক পদাধিকারবলে ওই কমিটির সভাপতি।
এছাড়া বহু মাজারে নগদ অর্থ ছাড়াও গরু, ছাগল, মুরগিসহ বিভিন্ন ধরনের দান আসে। এসব সম্পদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্পষ্ট কোনো জাতীয় নীতিমালা নেই বলেই সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। স্থানীয় প্রশাসনও বিষয়টিকে স্পর্শকাতর বিবেচনা করে অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকে।
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে ইয়ারউদ্দিন খলিফার মাজার (Yaruddin Khalifa Shrine)-এর সাধারণ সম্পাদক মো. শহিদ মল্লিক জানান, তাদের সারাদেশে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার দানবাক্স রয়েছে। মানুষের দান ও মানতই প্রধান আয়ের উৎস। বছরে প্রায় তিন কোটি টাকা দান পাওয়া যায়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে মাজারটি পুরোপুরি ওয়াকফ এস্টেটের আওতায় আনা হয়। বর্তমানে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে গঠিত কমিটি মাজার পরিচালনা করে। এখানকার মাদ্রাসা, মসজিদ, শিক্ষক, কর্মচারী এবং দুস্থ মানুষের খাদ্যব্যবস্থা থেকে শুরু করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড—সবই এই তহবিল থেকে পরিচালিত হয়।
শাহজালাল মাজার কি ওয়াকফ সম্পত্তি?
বাংলাদেশ সরকারের ওয়াকফ প্রশাসন (Waqf Administration Bangladesh)-এর প্রশাসক সাফিজ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, শাহজালাল মাজার তালিকাভুক্ত ওয়াকফ সম্পত্তি।
তার মতে, বাংলাদেশের সব মাজার, মসজিদ, কবরস্থান ও ঈদগাহ মূলত ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯১৩ সালের আইন অনুযায়ী এসব সম্পত্তির ওয়াকফ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক।
তিনি জানান, ওয়াকফ সাধারণত তিন ধরনের—ওয়াকফ ফি লিল্লাহ, ওয়াকফ আলাল আওলাদ এবং ব্যবহারিক ওয়াকফ। কোনো সম্পত্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে স্থায়ীভাবে দান করা হলে তা ওয়াকফ ফি লিল্লাহ, আয়ের একটি অংশ উত্তরসূরিদের জন্য নির্ধারণ করলে তা ওয়াকফ আলাল আওলাদ এবং ঈদগাহ, মসজিদ বা কবরস্থানের মতো ধর্মীয় অবকাঠামো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহারিক ওয়াকফ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সাফিজ উদ্দিন আহমেদের মতে, শাহজালাল মাজার এই তিন ধরনের বৈশিষ্ট্যই বহন করে এবং ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত।
সরকার ওয়াকফ সম্পত্তি তদারকি ও ব্যবস্থাপনার জন্য ওয়াকফ প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে থাকে। আর ওয়াকফ সম্পত্তি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মুতওয়াল্লি বলা হয়।
উল্লেখ্য, গত বছর ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন জানিয়েছিলেন, ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ে নিবন্ধিত সম্পত্তির মধ্যে প্রায় ৮৫ হাজার ৫৭২ একর ভূমি বেহাত হওয়ার তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে এবং সেগুলো উদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ওয়াকফ এস্টেটের সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার। এসব এস্টেটের আওতায় মোট জমির পরিমাণ প্রায় চার লাখ ২৪ হাজার ৭৪ একর।
