কর্মী সংকটে রোবটনির্ভর ব্যবসা বাড়ছে দক্ষিণ কোরিয়ায়, ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকছে কর্মীহীন দোকান

ফুলের দোকান, কফিশপ কিংবা মুখরোচক রামেনের দোকান—কোথাও নেই প্রচলিত অর্থে কোনো কর্মী। কাউন্টারে দাঁড়িয়ে অর্ডার নেওয়ার মানুষ নেই, কফি বানানোর ব্যস্ত বারিস্টাও নেই। তার বদলে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়েছে রোবট, আর কোথাও কোথাও পুরো ব্যবসাই চলছে কোনো ধরনের লোকবল ছাড়াই। এই বদলে যাওয়া দৃশ্য এখন দক্ষিণ কোরিয়া (South Korea) জুড়ে ক্রমেই পরিচিত হয়ে উঠছে।

দেশটিতে শ্রমিক সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক উদ্যোক্তাকেই ব্যবসা চালিয়ে নিতে রোবটের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। আবার কিছু দোকানি রোবটের ওপরও নির্ভর করেন না। তারা এমনভাবে দোকান সাজিয়েছেন, যেখানে গ্রাহকদের নিজেকেই সেবা নিতে হয়। পণ্য বেছে নেওয়া, অর্ডার করা, মূল্য পরিশোধ—সবকিছুই গ্রাহকের হাতে। এই ব্যবস্থায় দোকানিকে অনেকটাই নির্ভর করতে হয় ক্রেতাদের সততা ও সামাজিক শৃঙ্খলার ওপর।

দক্ষিণ কোরিয়ায় ছোট ছোট কাজের জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। কর্মী পাওয়া গেলেও তার জন্য গুনতে হচ্ছে চড়া মজুরি। এমন পরিস্থিতিতে ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা কর্মীহীন দোকানের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালেই এ ধরনের দোকানের সংখ্যা ছিল ৯ হাজারের বেশি। অনলাইন পেমেন্ট সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্যামসাং কার্ড (Samsung Card) জানিয়েছে, এমন দোকানের সংখ্যা চারগুণ বেড়েছে।

বিশ বছরের কাছাকাছি বয়সী তরুণ বারিস্টাদের, অর্থাৎ কফি প্রস্তুতকারকদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন লাউঞ্জ এক্স (Lounge X)-এর প্রধান নির্বাহী কিম দংজিন (Kim Dongjin)। তার কফিশপগুলোতে ‘বারিস’ নামের একটি রোবোটিক হাত স্বয়ংক্রিয় কিওস্কে দেওয়া অর্ডার অনুযায়ী পেপার কাপে আমেরিকানো ও মাচা লাতে পরিবেশন করে। দক্ষিণ কোরিয়া জুড়ে, বিশেষ করে রাজধানী সিউল (Seoul)-এ তাদের এমন আটটি ২৪ ঘণ্টার সম্পূর্ণ কর্মীহীন কফিশপ রয়েছে।

এর বাইরে আরও চারটি আউটলেটে রোবটের পাশাপাশি মানুষও কফি তৈরির কাজে সহায়তা করে। বিশ্বজুড়ে ব্রিটেন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে ক্যাশিয়ারবিহীন মুদি দোকানের ধারণা আগেই দেখা গেছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ায় এই প্রবণতা আরও বিস্তৃত রূপ নিয়েছে। কেবল মুদি দোকান নয়, পোষা প্রাণীর সামগ্রীর দোকান থেকে শুরু করে কাপড়ের বুটিক পর্যন্ত এখন কর্মীহীন ব্যবসা মডেলের আওতায় আসছে। এ খবর দিয়েছে রয়টার্স (Reuters)।

দক্ষিণ কোরিয়ায় জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বের সর্বনিম্ন জন্মহারের বাস্তবতা। ফলে দেশটিতে তীব্র শ্রম সংকট তৈরি হয়েছে। দেশটির সরকারের আশঙ্কা, বর্তমানে ৫ কোটি ১৮ লাখের যে জনসংখ্যা রয়েছে, তা ২০৭২ সালের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে ৩ কোটি ৬২ লাখে নেমে যেতে পারে।

কফি শিল্পে ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কিম জানান, দক্ষ বারিস্টা খুঁজে পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতা থেকেই লাউঞ্জ এক্সের মূল প্রতিষ্ঠান ‘এক্সওয়াইজেড রোবোটিক্স’ ২০২৪ সালে কর্মীহীন ক্যাফে চালু করে। এসব ক্যাফেতে মানুষের কাজ বলতে মূলত সকালে প্রায় এক ঘণ্টার জন্য কফি বিন ও বেকারি পণ্য রিফিল করা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা তদারকি করা।

প্রথাগত কফিশপের তুলনায় কর্মীহীন এসব শপে বিক্রির পরিমাণ কিছুটা কম। কিন্তু শ্রম ব্যয় বেঁচে যাওয়ায় মুনাফার অঙ্ক বদলে গেছে বড়ভাবে। আগে যেখানে মুনাফার হার ছিল ১০ থেকে ১৫ ভাগের মধ্যে, কর্মীহীন মডেলে তা এক লাফে ৪০ ভাগের ওপরে উঠে যাচ্ছে।

দোকানিরা বলছেন, এই মডেলের দিকে ঝোঁকার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ উপযুক্ত কর্মী না পাওয়া এবং ক্রমাগত বাড়তে থাকা মজুরি ব্যয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় ক্ষুদ্র অ’পরাধের হার অত্যন্ত কম। মানুষ সাধারণত নিয়ম মেনে চলে। এই সামাজিক বাস্তবতাও কর্মীহীন ব্যবসাকে তুলনামূলকভাবে সহজ করে তুলেছে।

গত বছর গৃহিণী থেকে উদ্যোক্তা হওয়া হিউন সুন-জু নামের এক নারী একটি কর্মীহীন রামেন রেস্তোরাঁ চালু করেন। তিনি জানান, সেখানে চু’\রির ঘটনা প্রায় নজিরবিহীন। অধিকাংশ গ্রাহক অত্যন্ত সততার সঙ্গে দোকান ব্যবহার করেন। এই সেলফ-সার্ভিস ব্যবস্থায় ক্রেতারা দেয়ালের তাক থেকে নিজেদের পছন্দের ইনস্ট্যান্ট রামেন বেছে নেন, এরপর গরম পানি ও টপিংস যোগ করে খাবার প্রস্তুত করেন।

এই ব্যবস্থা হিউনের জীবনেও বদল এনেছে। তাকে সারাদিন দোকানে বসে থাকতে হয় না। সন্তান ও সংসারের কাজ সামলে তিনি ব্যবসা চালাতে পারছেন, একই সঙ্গে বাড়তি আয়ের পথও তৈরি হয়েছে। শ্রমিক সংকট, প্রযুক্তির ব্যবহার, মজুরি ব্যয় এবং সামাজিক আস্থার এই মিলিত বাস্তবতাই দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মীহীন দোকানের বিস্তারকে আরও দৃশ্যমান করে তুলছে।