বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আবারও ইউরোপের প্রতিপক্ষ। দুই দশক ধরে তাড়া করে বেড়ানো হতাশার স্মৃতি এবার পেছনে ফেলে নতুন গল্প লিখতে চায় ব্রাজিল (Brazil)। নিউ জার্সিতে ম্যাচ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে সেই বার্তাই দিলেন দলের ৯ নম্বর ফরোয়ার্ড ম্যাথিয়াস কুনিয়া (Matheus Cunha)। তার ভাষায়, পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা এবার অতীতের সব হিসাব বদলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে।
বিশ্বকাপে কখনো শেষ ষোলোর গণ্ডি পেরোতে না পারা নরওয়ে (Norway)-র বিপক্ষে ব্রাজিল চারবার মুখোমুখি হলেও একবারও জয় পায়নি। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ২-১ ব্যবধানে নরওয়ের জয় এখনো দেশটির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। তবে কুনিয়ার বিশ্বাস, এবার সেই ইতিহাস বদলানোর সময় এসেছে।
তিনি বলেন, ‘অতীতের ভূত তাড়াতে হলে মাঠে নিজেদের কাজটা ঠিকভাবে করতে হবে। আশা করি এবার আমরা নতুন গল্প লিখতে পারব।’
ব্রাজিলের এই নতুন গল্প লেখার পথে সবচেয়ে বড় মানসিক বাধা গত দুই দশকের ইতিহাস। ২০০২ বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে প্রতিটি আসরেই ইউরোপের কোনো না কোনো দলের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে সেলেসাওরা। ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, বেলজিয়াম এবং ক্রোয়েশিয়া—প্রতিবারই ‘হেক্সা’ জয়ের স্বপ্ন ভেঙেছে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষ। এবার শেষ ষোলোতে সামনে নরওয়ে, তাই পুরোনো স্মৃতি স্বাভাবিকভাবেই ব্রাজিল সমর্থকদের মনে উদ্বেগ তৈরি করছে।
তবে রাউন্ড অব ৩২-এ জাপানকে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করার পর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর আনচেলত্তির দল। ম্যাচ যত এগোচ্ছে, আক্রমণের ধার বাড়ার পাশাপাশি রক্ষণও আরও সংগঠিত হয়ে উঠছে। সামনে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও কুনিয়া যেমন প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি, তেমনি রক্ষণে দানিলো ও দগলাস সান্তোসদের দৃঢ়তা দলকে বাড়তি ভরসা দিচ্ছে।
দগলাস সান্তোসও অতীতের ব্যর্থতাকে প্রেরণা হিসেবেই দেখছেন। তার ভাষায়, ‘নরওয়েকে হারাতে না পারার যে কলঙ্ক, সেটি মুছে ফেলতে পারা আমাদের জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা হতে পারে।’
এদিকে তিন গোল করা কুনিয়ার ভূমিকাও বদলাতে দেখা যাচ্ছে। শুধু আক্রমণ নয়, অনুশীলনে তাকে সেট-পিস সামলানোর কাজেও দেখা গেছে। মরিসটাউনে অনুষ্ঠিত সেই অনুশীলন কভার করেছেন ১৫ জন নরওয়েজিয়ান সাংবাদিক, ফলে ব্রাজিলের প্রস্তুতির অনেকটাই প্রতিপক্ষ শিবিরের জানা হয়ে গেছে।
নরওয়ের দৃষ্টিতে ম্যাচটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্য আর্লিং হলান্ড (Erling Haaland) বনাম ব্রাজিলের রক্ষণভাগ। ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার এই স্ট্রাইকারকে থামাতে প্রিমিয়ার লিগ ও বুন্দেসলিগায় মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাইবেন ব্রাজিলের ডিফেন্ডাররা। তবে তার আগে মাঝমাঠে বড় ধাক্কা খেয়েছে দলটি।
চোটের কারণে ছিটকে গেছেন মিডফিল্ডার লুকাস পাকেতা। তার জায়গায় কে খেলবেন, তা গোপন রেখেছেন কার্লো আনচেলত্তি (Carlo Ancelotti)। যদিও অনুশীলনে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিকে পাকেতার ভূমিকায় দেখা গেছে। জাপানের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে যে একাদশ খেলেছিল, অনুশীলনেও মূলত সেই কাঠামোই বারবার পরীক্ষা করেছেন ইতালিয়ান কোচ।
আনচেলত্তির জন্য ম্যাচটি ব্যক্তিগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। ক্লাব ফুটবলে হলান্ডের বিপক্ষে আটবার মুখোমুখি হয়ে তিনি দুটি ম্যাচ জিতেছেন, দুটি হেরেছেন এবং চারটি ড্র করেছেন। এবার জাতীয় দলের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে সেই লড়াইয়ে নতুন অধ্যায় যোগ করার সুযোগ তার সামনে।
অন্যদিকে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে জয়সূচক গোল করা সাবেক নরওয়েজিয়ান মিডফিল্ডার কেইটেল রেকডাল মনে করছেন, চাপটা পুরোপুরি ব্রাজিলের ওপরই থাকবে। তার মতে, অতীতের ব্যর্থতার স্মৃতি আবারও সেলেসাওদের পা হড়কানোর শঙ্কা তৈরি করতে পারে।
তবে পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এ বিশ্বকাপে সবচেয়ে সফল দলগুলোর একটি ব্রাজিল। এখন পর্যন্ত তাদের করা ৯ গোলের মধ্যে ৪টিই এসেছে প্রতিপক্ষের ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে। আর এটিই নরওয়ে কোচ স্তালে সলবাক্কেনের অন্যতম বড় দুশ্চিন্তার কারণ। কারণ, তার দলের রক্ষণভাগের বক্সের আশপাশে বল হারানোর প্রবণতা রয়েছে।
এর সঙ্গে ম্যাচের শেষদিকে বদলি হিসেবে নেইমারের মাঠে নামার সম্ভাবনাও নরওয়ের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে দুই দশকের ইউরোপীয় হতাশা পেছনে ফেলে নতুন ইতিহাস লেখার লক্ষ্যে কোনো প্রস্তুতিই অসম্পূর্ণ রাখতে চাইছে না ব্রাজিল।


