একসময় ইউরোপের আকাশে তাকে দেখলেই মনে হতো, যেন গোল করার জন্যই তার জন্ম। গোলপোস্ট তার কাছে কখনোই কেবল দুটি বার আর একটি ক্রসবার ছিল না; সেটি ছিল শিকার খুঁজে পাওয়া এক অদৃশ্য অরণ্য। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপ বরাবরই তার জন্য ছিল অধরা। কারণ, নরওয়ে (Norway) পৌঁছাতেই পারত না ‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’-এ।
এদিকে আর্লিং হালান্ড (Erling Haaland)-এর পায়ের জাদুতে আলোকিত হতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে প্রিমিয়ার লিগ। অথচ বিশ্বকাপের ইতিহাসে তার নামের পাশে ছিল এক বিশাল শূন্যতা। সেই শূন্যতার গভীরেই যেন ঘু’\মিয়ে ছিল এক দৈত্য। অবশেষে তিন দেশের উন্মাদনায় আয়োজিত বিশ্বকাপের মঞ্চে ভেঙেছে সেই ঘু’\ম। আর সেই জাগরণের ছন্দে এগিয়ে চলেছে নরওয়ের ভাইকিংরা।
বিশ্বকাপ মানেই এতদিন ছিল লিওনেল মেসি (Lionel Messi), রোনালদো, নেইমার কিংবা এমবাপ্পেদের মঞ্চ। হালান্ড ছিলেন কেবল দর্শক। টেলিভিশনের পর্দায় অন্যদের উৎসব দেখেছেন, আর নিজের দেশের ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাস শুনেছেন। বছরের পর বছর একই প্রশ্ন তার পিছু নিয়েছে—‘তুমি এত বড় স্ট্রাইকার, অথচ বিশ্বকাপে নেই?’
মুখে সেই প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি। উত্তর জমিয়ে রেখেছিলেন নিজের বুটে।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেই শুরু হয়েছিল সেই জবাব। মাত্র ৮ ম্যাচে ১৬ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট করে নরওয়েকে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরিয়ে আনেন তিনি। একই সঙ্গে যেকোনো মহাদেশের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও গড়ে বসেন। সেই যাত্রাই এসে মিশেছে দক্ষিণ আমেরিকার বিশ্বকাপ মঞ্চে। আর সেখানে এসেও থামেননি তিনি।
প্রথম ম্যাচ থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায়, তিনি শুধু অংশ নিতে আসেননি; এসেছেন নিজের ইতিহাস লিখতে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের পাশ কাটিয়ে নয়, যেন তাদের শক্তিকেই অগ্রাহ্য করে এগিয়ে গেছেন। ৬ ফুট ৫ ইঞ্চির এই ফরোয়ার্ডকে থামাতে পারেনি গতি, ট্যাকল কিংবা শারীরিক লড়াই। একের পর এক গোল যেন বছরের পর বছর জমে থাকা ক্ষুধার বিস্ফোরণ।
অনেকে বলেন, স্ট্রাইকাররা গোলে বেঁচে থাকে। হালান্ড যেন সেই সংজ্ঞাকেও নতুন করে লিখছেন। তিনি শুধু গোল করেন না, গোলকেই নিজের ভাষায় পরিণত করেছেন। কখনও দুর্দান্ত হেড, কখনও বাঁ-পায়ের নিখুঁত শট, আবার কখনও দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাকে প্রতিপক্ষকে ভেঙে পড়তে বাধ্য করেন। তার প্রতিটি দৌড়ে মনে হয়, তিনি ডিফেন্ডারদের সঙ্গে নয়, সময়ের সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করছেন। ৭ গোল করে তিনি এখন মেসি ও এমবাপ্পের কাতারে।
নরওয়ের এই পথচলা কেবল একটি দলের নয়, বরং একটি জাতির বহু বছরের অপেক্ষার গল্প। ১৯৯৮ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজেদের আর দেখা পায়নি তারা। প্রজন্ম বদলেছে, কোচ বদলেছে, অসংখ্য স্বপ্ন ভেঙেছে। কিন্তু এবার সেই স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছেন এক স্বর্ণকেশী তরুণ, যার চোখে ভয় নেই—আছে কেবল শেষ পর্যন্ত পৌঁছানোর দৃঢ় বিশ্বাস।
ব্রাজিল (Brazil)-এর বিপক্ষে ম্যাচেই যেন নিজের পূর্ণ রূপ প্রকাশ করলেন হালান্ড। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে তিনি শুধু গোলই করেননি, ভেঙে দিয়েছেন তাদের আত্মবিশ্বাসও। প্রথমে নিখুঁত এক হেড, এরপর শেষ মুহূর্তে ঠান্ডা মাথার দুর্দান্ত ফিনিশ। তার দ্বিতীয় গোলের আগে ঘণ্টায় ১২৮ কিলোমিটার গতির শট ঠেকানোর সুযোগই পাননি আলিসন বেকার। যেন গোটা ফুটবল বিশ্বকে তিনি জানিয়ে দিলেন—নতুন যুগের আলোচনায় তার নামও থাকবে।
সেই ম্যাচের পর ব্রাজিল বিদায় নেয়, নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারেরও ইতি ঘটে। আর একই রাতে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে হালান্ড নামের নতুন নক্ষত্র।
তবে তার বিশ্বকাপকে শুধু গোলের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ করলে ভুল হবে। এবার তাকে দেখা যাচ্ছে নতুন এক ভূমিকায়। গোলমুখী স্ট্রাইকারের পাশাপাশি তিনি হয়ে উঠেছেন একজন নেতা। সামনে থেকে প্রেস করছেন, সতীর্থদের সাহস জোগাচ্ছেন, প্রয়োজন হলে মাঝমাঠে নেমে বলও কাড়ছেন। তার প্রতিটি দৌড় বলে দেয়, তিনি শুধু গোল্ডেন বুটের জন্য খেলছেন না; খেলছেন নরওয়ের পতাকাকে আরও কিছুদিন বিশ্বকাপের আকাশে উড়িয়ে রাখার জন্য। প্রতিটি গোল উদযাপনেও অহংকারের চেয়ে কৃতজ্ঞতার প্রকাশই বেশি স্পষ্ট।
গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এখন তিনি লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে (Kylian Mbappé)-এর সঙ্গে সমানতালে এগোচ্ছেন। তিনজনের গোলসংখ্যাই সমান। তবে হালান্ডের গল্প আলাদা। কারণ, অন্য দুজনের বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা বহু বছরের। আর তিনি প্রথমবার এসেই যেন বহুদিন ধরে আটকে থাকা এক নদীর মতো সব বাঁধ ভেঙে নিজের স্রোতে ছুটে চলেছেন।
ফুটবল মাঝেমধ্যে রূপকথা লেখে। কিন্তু হালান্ডের এই গল্প রূপকথা নয়। এটি দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প। অপূর্ণতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের গল্প। এমন এক গল্প, যার সারমর্ম—আলো থেকে যত দূরেই থাকো না কেন, সময় এলে নিজেকেই সূর্য হয়ে উঠতে হয়।
একসময় বিশ্বকাপ তাকে মিস করেছে। আজ বিশ্বকাপ তাকেই দেখছে। তার প্রতিটি গোলের সঙ্গে মনে হচ্ছে, এতদিন যে ঘু’\মন্ত দৈত্যটি অপেক্ষা করছিল, সে আর থামতে রাজি নয়। সে এগিয়ে চলেছে একটি জাতির স্বপ্ন কাঁধে নিয়ে। সামনে এখনও দীর্ঘ পথ। আর সেই পথের শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করছে সোনালি ট্রফি।
হালান্ডের চোখে এখন সেই স্বপ্নেরই প্রতিফলন। আর ফুটবল বিশ্ব বিস্ময়ে দেখছে—এক ঘু’\মন্ত দৈত্যর জেগে ওঠার ইতিহাস।


