কী ঘটেনি এই ম্যাচে! দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, তবু হৃদয় জিতে নিল মিসর

ফুটবল কখনো শুধুই নব্বই মিনিটের খেলা নয়। কখনো তা এক মহাকাব্য, কখনো যুদ্ধ, কখনো অবিশ্বাস্য নাটক। আবার কখনো এমন এক গল্প, যেখানে একই রাতে জন্ম নেয় একাধিক নায়ক। মিয়ামির এই রাত ছিল ঠিক তেমনই—রোমাঞ্চ, বিস্ময়, বেদনা, প্রত্যাবর্তন আর কিংবদন্তির এক অনন্য মিশেল।

প্রায় আশি মিনিট ধরে মোস্তফা সোবেইর (Mostafa Sobhy) একাই যেন আটকে রেখেছিলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগকে। লিওনেল মেসির নেওয়া পেনাল্টি ফিরিয়ে দিয়েছেন গ্লাভসে। একটি গোল ভিএআরের সিদ্ধান্তে বাতিল হয়েছে। দুই গোলে এগিয়ে থেকে ইতিহাস ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখেছিল মিসর। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শেষভাগে মাত্র আট মিনিটের ঝড়ে বদলে গেল সবকিছু। পাল্টে গেল ম্যাচের রং, স্কোরলাইন, ভাগ্য, এমনকি গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রও।

শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা (Argentina) ৩-২ গোলে জয় তুলে নিল। কিন্তু এই ম্যাচ যতবার স্মরণ করা হবে, ততবারই একটাই প্রশ্ন ফিরে আসবে—কী ঘটেনি এই ম্যাচে?

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অসংখ্য স্মরণীয় ম্যাচ রয়েছে। রয়েছে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, বেদনাদায়ক পরাজয় এবং কিংবদন্তি মুহূর্ত। তবে একই ম্যাচে এত নাটকীয়তা, এত সৌন্দর্য, এত বীরত্ব, এত আবেগ এবং এত চরিত্রের সমাবেশ খুব কমই দেখা গেছে। তাই এই রাত শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ নয়; এটি ফুটবলের মঞ্চে রচিত এক অনন্য মহাকাব্য।

এই মহাকাব্যের প্রথম অধ্যায়ের নাম ছিল শুধুই মিসর।

বিশ্বকাপে কখনো শেষ ষোলোর গণ্ডি পেরোতে না পারা দলটি স্বপ্ন দেখছিল কোয়ার্টার ফাইনালের। প্রতিপক্ষও আর কেউ নয়—বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।

১৫ মিনিটে মারওয়ান আত্তিয়ার কর্নার থেকে উঠে আসা বলে ইয়াসের ইব্রাহিমের দুর্দান্ত হেডে এগিয়ে যায় মিসর। বল জালে জড়িয়ে যাওয়ার মুহূর্তে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ শুধু দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি। গ্যালারিতে তখন উল্লাসের বিস্ফোরণ।

সেই গোলের পরই যেন বিশ্বাস জন্মায়—অসম্ভবও সম্ভব হতে পারে।

এরপর আসে এমন এক মুহূর্ত, যা বহু বছর বিশ্বকাপের স্মৃতিতে জায়গা করে নেবে।

পেনাল্টি পেল আর্জেন্টিনা। বলের পেছনে দাঁড়ালেন লিওনেল মেসি (Lionel Messi)। স্টেডিয়ামজুড়ে নেমে এল নিস্তব্ধতা। কোটি দর্শকের চোখ তখন একটাই দৃশ্যে—বল জালে যাবে।

কিন্তু গোললাইনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক স্বপ্নবাজ।

মোস্তফা সোবেইর নিখুঁতভাবে অনুমান করলেন শটের দিক। সময়মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে রুখে দিলেন পেনাল্টি। মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ল মিসর। তিনি শুধু একটি পেনাল্টিই ঠেকাননি, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আত্মবিশ্বাসেও বড় ধাক্কা দিয়েছিলেন।

এরপর যেন তিনি আর শুধু গোলরক্ষক ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন দুর্ভেদ্য প্রাচীর। ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড, আলভারেজের নিশ্চিত গোল, একের পর এক শট—সবই আটকে দিলেন অসাধারণ দক্ষতায়। আর্জেন্টিনা যতবার আক্রমণে উঠেছে, ততবারই মনে হয়েছে গোলপোস্টে একজন মানুষ নয়, দাঁড়িয়ে আছে এক অদৃশ্য দুর্গ।

১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই প্রথমার্ধ শেষ করে মিসর।

দ্বিতীয়ার্ধে সেই স্বপ্ন আরও বড় হয়ে ওঠে।

প্রথমে মোস্তফা জিকোর করা একটি দারুণ গোল ভিএআরের সিদ্ধান্তে বাতিল হয়। রেফারি জানান, আক্রমণ গড়ে ওঠার সময় ফাউল হয়েছিল। মুহূর্তেই উল্লাস থেমে যায়, শুরু হয় বিতর্ক।

কিন্তু সেই ধাক্কায় ভেঙে পড়েনি মিসর।

৬৭ মিনিটে আবারও একই দৃঢ়তায় ফিরে আসে তারা। সালাহর বাড়ানো বল থেকে হাসানের দৌড়, এরপর মোস্তফা জিকোর নিখুঁত ফিনিশিং। এবার আর কোনো আপত্তি নয়, কোনো বাঁশিও নয়। স্কোরবোর্ডে তখন স্পষ্ট লেখা—আর্জেন্টিনা ০, মিসর ২।

সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের যাত্রা বুঝি এখানেই থেমে যাবে।

কিন্তু কিংবদন্তিরা হার মেনে গল্প শেষ করেন না। তারা ফিরে এসে নতুন গল্প লেখেন।

৭৯ মিনিটে মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে রোমেরোর হেডে একটি গোল শোধ করে আর্জেন্টিনা।

চার মিনিট পর আবারও আঘাত। এবার গোল করেন মেসি নিজেই। বক্সের ভেতরে ভেসে আসা বলকে দুর্দান্ত ভলিতে জালে জড়িয়ে তিনি যেন কয়েক মিনিট আগের সব হতাশার জবাব এক স্পর্শেই দিয়ে দিলেন।

এই গোলের মাধ্যমে আরও একটি মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলেন মেসি। টানা নবম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার কীর্তি গড়েন তিনি। চলতি বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচেই জালের দেখা পাওয়ার ধারাও বজায় থাকে তার।

স্কোর তখন ২-২।

কিন্তু নাটকের শেষ দৃশ্য তখনও বাকি।

ইনজুরি সময়ে পাল্টা আক্রমণ থেকে লাউতারোর দীর্ঘ পাস পেয়ে পেনাল্টি বক্সের সামনে দারুণ এক হেড করেন এনজো। বল জালে জড়াতেই বিস্ফোরিত হয় পুরো স্টেডিয়াম। সেই গোলেই নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার ৩-২ ব্যবধানের জয় এবং কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা।

শেষ পর্যন্ত হিসেবটা দাঁড়ায়—মাত্র আট মিনিটে তিন গোল। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন। অসম্ভবকে সম্ভব করে শেষ আটে জায়গা করে নেয় আর্জেন্টিনা।

তবুও এই রাত শুধু বিজয়ীদের নয়।

এই রাত মোস্তফা সোবেইরের, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের থামিয়ে রেখেছিলেন।

এই রাত মিসরেরও, যারা হারলেও ফুটবলকে আরও সমৃদ্ধ করেছে নিজেদের সাহস আর লড়াই দিয়ে।

আর নিঃসন্দেহে এই রাত লিওনেল মেসিরও।

কিংবদন্তিরাও ভুল করেন। কিন্তু তাদের আলাদা করে তোলে ভুলের পর ফিরে আসার ক্ষমতা। পেনাল্টি মিস করার পর গোল করেছেন, গোল করিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত দলকে জয়ের পথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ম্যাচ শেষে তার চোখের আবেগ যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিল—ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি অনুভূতিরও আরেক নাম।

কিছু ম্যাচ শেষ বাঁশির সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। কিছু ম্যাচ ট্রফির ইতিহাসে বেঁচে থাকে। আর কিছু ম্যাচ সময়ের বুকেই নিজের নাম লিখে দেয়।

মিয়ামির এই রাত ছিল ঠিক তেমনই।

এই ম্যাচ আবারও প্রমাণ করল, ফুটবলের সবচেয়ে বড় জাদুকর বল নয়—অনিশ্চয়তা। আর সেই কারণেই ফুটবল এত অসাধারণ, এত সুন্দর।