ক্ষ’\মতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina)-র মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল (Saima Wazed Putul) দীর্ঘ ২৫ বছরের সংসারজীবনের ইতি টেনেছেন। স্বামী খন্দকার মাশরুর হোসেন (Khandker Mashroor Hossain)-এর সঙ্গে ২০২১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই (Dubai)-এর একটি আদালতে তার বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়।
তবে বিচ্ছেদের বিষয়টি সে সময় প্রকাশ্যে আসেনি। সম্প্রতি আদালতের নথি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সম্পত্তি রেকর্ডের বরাতে তাদের বিচ্ছেদ চুক্তি, নগদ অর্থ পরিশোধ, দুটি বাড়ির মালিকানা হস্তান্তর এবং সন্তানদের অভিভাবকত্ব নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, বিবাহবিচ্ছেদ চুক্তির অংশ হিসেবে খন্দকার মাশরুর হোসেন সায়মা ওয়াজেদকে নগদ আড়াই লাখ মার্কিন ডলার দিয়েছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা বর্তমান বিনিময় হারের হিসাবে এ অর্থের পরিমাণ তিন কোটি টাকারও বেশি।
নগদ অর্থের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা (Florida) অঙ্গরাজ্যে তাদের যৌথ মালিকানায় থাকা দুটি বাড়ির মালিকানাও সায়মা ওয়াজেদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, বাড়ি দুটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। নগদ অর্থ ও সম্পত্তির মূল্য মিলিয়ে বিচ্ছেদ চুক্তিতে সায়মা ওয়াজেদের পাওয়া সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৩ কোটি ৫২ লাখ টাকার সমান।
দুবাই আদালতের ফ্যামিলি গাইডেন্স অ্যান্ড রিফর্মেশন বিভাগে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে বলা হয়েছে, ফ্লোরিডার সেন্ট জনস কাউন্টির ফ্রুট কোভ এলাকার ৪৫৬ বে পয়েন্ট ওয়ে এবং মেইটল্যান্ডের ৮৪৫ ইয়র্ক ওয়ে-এ অবস্থিত দুটি বাড়ি ‘নেভা ইনকরপোরেটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
নথিতে নেভা ইনকরপোরেটেডের একমাত্র আইনি মালিক ও সুবিধাভোগী হিসেবে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কাছে বাড়ি দুটি হস্তান্তর করা হলেও সেগুলোর কার্যকর মালিকানা সায়মা ওয়াজেদের কাছেই থাকবে।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, বিয়ের সময় পাওয়া উপহার, ব্যক্তিগত আসবাবপত্র, পোশাক, অলংকার এবং অন্যান্য স্মারকও পুতুলকে ফিরিয়ে দিতে হবে। তিনি যে স্থানে এসব সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেবেন, সেখানে সেগুলো পৌঁছানোর দায়িত্ব খন্দকার মাশরুর হোসেনের ওপর থাকবে।
সরকারি সম্পত্তি রেকর্ড অনুযায়ী, সেন্ট জনস কাউন্টির বাড়িটি ২০০৫ সালের ১ নভেম্বর সায়মা ওয়াজেদ ও খন্দকার মাশরুরের যৌথ নামে ২ লাখ ৪৫ হাজার মার্কিন ডলারে কেনা হয়েছিল। বর্তমানে বাড়িটির বাজারমূল্য প্রায় ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪৪০ ডলার বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে মেইটল্যান্ডের বাড়িটি একতলা। এতে চারটি শয়নকক্ষ ও দুটি বাথরুম রয়েছে। সম্পত্তির বাজারসংক্রান্ত রেকর্ড অনুযায়ী, বাড়িটির বর্তমান মূল্য প্রায় ৪ লাখ ৮৪ হাজার থেকে ৫ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে।
সায়মা ওয়াজেদ ও খন্দকার মাশরুর হোসেনের চার সন্তান রয়েছে। বিচ্ছেদ চুক্তিতে সন্তানদের দেখাশোনা, আইনগত অভিভাবকত্ব এবং ব্যয় বহনের বিষয়েও বিস্তারিত শর্ত রাখা হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই সন্তানের আইনগত অভিভাবক থাকবেন খন্দকার মাশরুর। তবে সন্তানরা সায়মা ওয়াজেদের কাস্টডি বা জিম্মায় থাকবে। সন্তানদের শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় সব ব্যয় বহন করবেন মাশরুর।
খন্দকার মাশরুর হোসেন আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে। ১৯৯৫ সালে ঢাকায় সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও মাশরুরের বিয়ে হয়। সে সময় শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেত্রী ছিলেন। পুতুল ও মাশরুর—দুজনই কানাডার নাগরিক ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর খন্দকার মোশাররফ হোসেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৯৬ সালে তিনি ফরিদপুর-৩ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন পেলেও নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি।
পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০০৯ সালে তিনি মন্ত্রিসভায় স্থান পান। প্রথমে তাকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের পর থেকে পুতুল ও মাশরুরের দাম্পত্য জীবনে টানাপোড়েন শুরু হয়। একই সময় থেকে খন্দকার মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক প্রভাবও কমতে থাকে।
তিনি মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদ থেকেও সরে যেতে হয় তাকে। ২০২১ সালে পুতুল ও মাশরুরের বিবাহবিচ্ছেদের পর খন্দকার মোশাররফের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দু’\র্নীতি, টেন্ডারবাজি ও দখলবাজির অভিযোগে অভিযান শুরু হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২২ সালে তার ভাই খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবর গ্রে’\প্তার হন। পরে খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ ছেড়ে সুইজারল্যান্ডে চলে যান বলেও সংশ্লিষ্ট তথ্যে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনয়নে সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization)-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত হন। ভারতের দিল্লিতে অবস্থিত সংস্থাটির আঞ্চলিক কার্যালয়ে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের প’\তনের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আপত্তির মুখে তিনি অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বিভিন্ন সূত্রের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যেও তাকে বর্তমানে ছুটিতে থাকা আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, সায়মা ওয়াজেদ বর্তমানে কানাডার পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন। তিনি সন্তানদের কাছে দুবাই এবং মায়ের কাছে দিল্লিতে যাতায়াত করেন বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
