ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ (Mahmoud Ahmadinejad)-কে ঘিরে একাধিক চাঞ্চল্যকর দাবি প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস (The New York Times)। পত্রিকাটির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে গোপনে আহমাদিনেজাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছিল এবং ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটলে তাকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য বিবেচনা করা হচ্ছিল। তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে আহমাদিনেজাদকে ইরানের ভেতরে একটি কথিত মোসাদ সেফ হাউজে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি।
নিউইয়র্ক টাইমসের দাবি অনুযায়ী, একসময় ইসরাইলবিরোধী কঠোর অবস্থান এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সমর্থক হিসেবে পরিচিত আহমাদিনেজাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ (Mossad)।
প্রতিবেদনে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে অবস্থিত লুদোভিকা ইউনিভার্সিটিতে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি সম্মেলনকে এই যোগাযোগের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর অধ্যাপক গেরগেলি ডেলির বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, হাঙ্গেরি সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তার অনুরোধে আহমাদিনেজাদকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, সেই সফরের সময় মোসাদের তৎকালীন প্রধান ডেভিড বার্নিয়ার সঙ্গে তার বৈঠক হয় এবং পরবর্তীতে বিষয়টি সিআইএকে জানানো হয়।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আহমাদিনেজাদের বিদেশ সফর ও আবাসনের কিছু ব্যয় গোপনে বহন করা হয় এবং গুয়াতেমালা ও হাঙ্গেরিতে তার সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব দাবির স্বপক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি।
নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর সময় তেহরানে আহমাদিনেজাদের বাসভবনে ইসরাইলি হামলার ঘটনাকে একটি পরিকল্পিত উদ্ধার অভিযানের অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, হামলার পর বিশৃঙ্খলার মধ্যে তাকে একটি গাড়িতে করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে এই ঘটনারও স্বাধীন কোনো যাচাই পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওই ঘটনার পর আহমাদিনেজাদ পরিকল্পনাটি নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন এবং পরে কীভাবে তিনি সেই স্থান ত্যাগ করেন, তা স্পষ্ট নয়।
আহমাদিনেজাদের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। বিশেষ করে টানা তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার পর তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে বিদ্যমান ব্যবস্থার অধীনে তার আর ক্ষমতায় ফেরা সম্ভব নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ঘনিষ্ঠদের কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে যুদ্ধ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পর যদি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল কোনো নির্বাসিত নেতাকে ক্ষমতায় আনে, তাহলে ইরান আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে তিনি নিজেকে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলতসিনের মতো একজন সংস্কারক হিসেবে দেখতেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস আরও দাবি করেছে, আহমাদিনেজাদ মনে করতেন তিনি ক্ষমতায় ফিরতে পারলে আব্রাহাম অ্যাকর্ডের আওতায় ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিতে পারবেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এ পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় রেখে ইরাকের উত্তরাঞ্চলে অবস্থানরত কিছু ইরানি কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীকেও প্রস্তুত করার পরিকল্পনা ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে।
প্রতিবেদনের শেষাংশে চারজন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তার বরাতে দাবি করা হয়েছে, ইসরাইলের সঙ্গে কথিত যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর আহমাদিনেজাদকে বর্তমানে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের গোয়েন্দা শাখা গৃহবন্দি করে রেখেছে। তবে এ বিষয়ে ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি এবং দাবিটি স্বাধীনভাবেও যাচাই করা সম্ভব হয়নি।


