চট্টগ্রামে চাঁদাবাজির নতুন আতঙ্ক ‘ডেভিড ইমন’, হামলা-হুমকি নিয়ে যা বলছে পুলিশ

চট্টগ্রামে চাঁদা দাবি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের একাধিক ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ‘ডেভিড ইমন’ নামটি। সম্প্রতি একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় তার নাম সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সোমবার নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা–বাকলিয়া এক্সেস সড়কে অবস্থিত ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) কার্যালয়ে ৩০ থেকে ৩৫ জনের একটি সশস্ত্র দল হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। হামলায় অফিসে ভাঙচুরের পাশাপাশি কর্মীদের বেতনের জন্য রাখা ৩৫ লাখ টাকা লুট করা হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানের দাবি।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক আদিল বিন মামুন অভিযোগ করেন, হামলার দুই দিন আগে বিদেশি একটি নম্বর থেকে ফোন করে নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি তার কাছে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং পরে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা না দিলে ব্যবসা পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না বলেও হুমকি দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।

তার অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দেওয়ার পরই প্রকাশ্যে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার পর প্রতিষ্ঠানটির সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতারের তথ্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশ যা বলছে

পুলিশের দাবি, চট্টগ্রাম নগরী, রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদা দাবি ও হামলার বেশ কয়েকটি ঘটনার পেছনে বিদেশে অবস্থানরত কথিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারীরা সক্রিয় রয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগে এই চক্রের নেতৃত্বে ছিলেন ছোট সাজ্জাদ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর মোবারক হোসেন ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন বলে অভিযোগ তদন্তকারীদের।

পুলিশ বলছে, ইমন ও রায়হানের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, অস্ত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। তবে তারা বর্তমানে আত্মগোপনে থাকায় গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

কে এই মোবারক হোসেন ইমন

পুলিশের তথ্যমতে, মোবারক হোসেন ইমনের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকায়। তিনি ২০২৫ সালের বাকলিয়া এলাকার জোড়া হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সংঘটিত ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাতেও তার নাম রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তদন্তকারীদের দাবি, তিনি অস্ত্র ব্যবহারে দক্ষ এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে বিচারাধীন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ‘ডেভিড ইমন’ নামে তিনি অপরাধজগতে পরিচিতি পান এবং পরে সাজ্জাদ আলী খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় হন।

আগের অভিযোগগুলোও তদন্তে

এর আগে বিভিন্ন ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছেও ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয়ে ফোন করে চাঁদা দাবি এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

গত মে মাসে এক সাংবাদিকের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং টাকা না দিলে গুলি করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগের ভিত্তিতে কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়।

এ ছাড়া গত বছরের আগস্টে হাটহাজারীতে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলির ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, তারা সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারী।

চলতি বছরের জুনে চান্দগাঁও এলাকার একটি পোশাক কারখানার সামনে প্রকাশ্যে গুলি ছোড়ার ঘটনাও তদন্তাধীন রয়েছে। পুলিশ বলছে, ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কেন গ্রেফতার করা যাচ্ছে না?

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (Chattogram Metropolitan Police)-এর সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ (Aminur Rashid) বলেন, মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন একজন পলাতক আসামি এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

তিনি জানান, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফোনকলের অডিও সম্পর্কে পুলিশ অবগত রয়েছে। তবে সেটি সত্যিই ডেভিড ইমনের কণ্ঠ কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।

আমিনুর রশিদ বলেন, আত্মগোপনে থেকে কেউ বিভিন্ন দাবি করতে পারেন। তবে পুলিশ তাকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে এবং সংশ্লিষ্ট সব অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।