চট্টগ্রামে ‘ডেভিড ইমন’কে ঘিরে নতুন বিতর্ক, হামলা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে তদন্ত জোরদার

বিলাসবহুল ভবনের ছাদে হাঁটতে হাঁটতে ফোনে কথা বলা, ব্যাকগ্রাউন্ডে হিন্দি গানের সুর, কখনো পাঁচতারকা হোটেলের লবিতে বৈঠক, আবার কখনো বিলাসবহুল বারে সময় কাটানো—এমন অসংখ্য ছবি ও ভিডিও নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছেন মোবারক হোসেন ইমন (Mubarak Hossain Imon), যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডেভিড ইমন’ নামে পরিচিত। তার ফলোয়ারও কয়েক লাখ। নির্দিষ্ট সংখ্যক অনুসারী পূর্ণ হলে ধন্যবাদ জানিয়ে ফটোকার্ডও প্রকাশ করেন তিনি। ফেসবুক প্রোফাইল ঘাঁটলে প্রথম দেখায় অনেকের কাছেই তাকে চলচ্চিত্র জগতের পরিচিত মুখ বলে মনে হতে পারে। বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনও তিনি নিজের অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছেন। তবে সম্প্রতি চট্টগ্রামে সংঘটিত একাধিক ঘটনার পর তাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ব্যবসায়ী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, রাজনীতিবিদ, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান, ইন্টারনেট ও ডিশ ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস খাতের উদ্যোক্তা এবং খাতুনগঞ্জের আড়তদারদের কাছ থেকে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, চাহিদামতো অর্থ না দিলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, বাড়ি লক্ষ্য করে গু’\লি চালানো কিংবা পরিবারের সদস্যদের হেনস্তার মতো ঘটনাও ঘটানো হচ্ছে। এসব অভিযোগে ডেভিড ইমন ও তার সহযোগীদের নাম উঠে এসেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পর থেকে চট্টগ্রাম (Chattogram)-এর আন্ডারওয়ার্ল্ডে ডেভিড ইমনের নাম বেশি আলোচনায় আসে। শুরুতে বিদেশে অবস্থানরত কথিত শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ (Boro Sajjad)-এর সহযোগী হিসেবে তার নাম সামনে এলেও পরে তিনি নিজস্ব প্রভাবও গড়ে তুলেছেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তবে বিভিন্ন সময় নিজের পরিচয়ে তিনি বড় সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবেই উল্লেখ করেছেন।

গত সোমবার দুপুরে নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোডে ডিডিএন নামের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে ৩০ থেকে ৩৫ জনের একটি সশস্ত্র দল হামলা ও ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে কথিত ডেভিড ইমনের একটি ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই অডিওতে নিজেকে ডেভিড ইমন পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি ব্যবসা পরিচালনা অব্যাহত রাখতে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন বলে শোনা যায়। একই সঙ্গে তিনি পুলিশ কমিশনার ও সাবেক সংসদ সদস্যের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। তবে অডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এর আগে গত ২ জানুয়ারি সকালে নগরীর চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান (Mostafizur Rahman)-এর বাসভবন লক্ষ্য করে গু’\লি চালানোর ঘটনা ঘটে। পরে ওই বাসার নিরাপত্তায় পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। এরপরও ২৮ ফেব্রুয়ারি আবারও একই বাসা লক্ষ্য করে গু’\লি চালানোর অভিযোগ ওঠে। সে সময় পুলিশ জানায়, চাঁদার দাবিকে কেন্দ্র করে ওই হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। পরে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে আর কোনো মন্তব্য করেননি।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (Chattogram Metropolitan Police)-এর কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী বলেন, বাকলিয়ার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় ডেভিড ইমনসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে একাধিক দল কাজ করছে। তিনি জানান, আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের মালিক আগে থেকে চাঁদা দাবির বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করেননি। ফলে আগাম নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডেভিড ইমন নিজেকে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে দাবি করলেও পুলিশের কাছে তার এমন অবস্থানের কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই। তিনি দেশে থেকেও বিদেশে অবস্থানের প্রচার চালিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে পারেন—এমন সম্ভাবনাও তদন্তে বিবেচনায় রাখা হয়েছে বলে জানান সিএমপি কমিশনার।