সাইবার স্পেস ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অবৈধ মা’\দক কেনাবেচার অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃ’\ত্যু’\দণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদ (Jatiya Sangsad) ‘মা’\দকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল ২০২৬’ পাস করেছে। গত ১৩ জুলাই বিলটি সংসদে পাস হলেও এখন পর্যন্ত এর গেজেট প্রকাশিত হয়নি। তবে আইনটির একটি বিধান ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে—ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত মা’\দক অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সরাসরি মা’\দক উদ্ধার হওয়া বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি।
ডিজিটাল যোগাযোগও হবে অপরাধের প্রমাণ
২০১৮ সালের মূল আইনের কয়েকটি ধারায় সংশোধন এনে নতুন বিলটি পাস করা হয়েছে। সংশোধিত আইনে মা’\দক অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে পৃথক ‘মা’\দকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল’ প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি ও সাইবার স্পেস ব্যবহার করে মা’\দক কেনাবেচা, সরবরাহ, বিজ্ঞাপন কিংবা এ-সংক্রান্ত যোগাযোগের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
পাস হওয়া বিল অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ, ই-ওয়ালেট অথবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মা’\দকের কারবার বা এ-সংক্রান্ত যোগাযোগ করলে সেটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এমন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির জন্য কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মৃ’\ত্যু’\দণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
অপরাধের সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোনো চক্রের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে জরিমানার পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। একই সঙ্গে অপরাধ সংঘটনে ব্যবহৃত ডিজিটাল ডিভাইস, অনলাইন অ্যাকাউন্ট বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মাধ্যম বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও দিতে পারবেন আদালত।
মা’\দক উদ্ধার ছাড়াই মামলা, বাড়ছে উদ্বেগ
ডিজিটাল অপরাধের ক্ষেত্রে সরাসরি মা’\দক উদ্ধার বাধ্যতামূলক না রাখার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইনজীবীদের একাংশ। তাদের আশঙ্কা, এ বিধানের কারণে কেবল ডিজিটাল যোগাযোগ বা স্ক্রিনশটের ওপর নির্ভর করে গুরুতর অভিযোগ আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of Bangladesh)-এর আইনজীবী ফেরদৌস হোসেন (Ferdous Hossain) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “কোনো মা’\দক উদ্ধার ছাড়াই শুধু চ্যাটিংয়ের একটি স্ক্রিনশটকে ডিজিটাল প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে মৃ’\ত্যু’\দণ্ড দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে আইনের অপব্যবহার ও পুলিশি হয়রানি বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।”
আদালতের আইনজীবী মো. নাজমুল হাসান বলেন, মা’\দক মামলায় অনেক সময় ল্যাব পরীক্ষার পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকায় আসামিরা খালাস পেয়ে যান। কিন্তু নতুন আইনে সরাসরি মা’\দক উদ্ধার না হলেও শুধু সাইবার যোগাযোগের সূত্র ধরে মামলা করার সুযোগ থাকছে। ফলে পরিকল্পিতভাবে কোনো নিরীহ ব্যক্তিকে ফাঁসানোর পথ তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
কঠোর আইনের পক্ষে যুক্তি, সঙ্গে সতর্কতার তাগিদ
তবে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ (Monzil Morshed) আইনটির প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতার পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, সাইবার স্পেস ব্যবহার করে মা’\দকের লেনদেন বন্ধ করতে হলে শক্ত ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য, আইনের কোনো ধরনের অপপ্রয়োগ ঘটলে তা জনমনে প্রশ্ন ও অবিশ্বাস তৈরি করবে। এর প্রভাবে মা’\দকবিরোধী অভিযানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অনলাইনে কারবার বাড়ায় নতুন কাঠামো
মা’\দকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ( Department of Narcotics Control ) মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জানান, করোনা মহামারির সময় থেকে অনলাইনে মা’\দক কেনাবেচার প্রবণতা বেড়েছে। ইয়া’\বা, ফে’\নসিডিল, আ’\ইস, এল’\এসডি ও কো’\কেনের মতো মা’\দক অনলাইনে অনুসরণ করে উদ্ধার করা হচ্ছে।
তার মতে, সাইবার নজরদারির মাধ্যমে মা’\দকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইনভিত্তিক কারবার বন্ধ করতেই নতুন এই আইনি কাঠামোর প্রয়োজন হয়েছে।
ম’\দপানের বিষয়ে তিনি বলেন, যাদের বৈধ পারমিট রয়েছে, তারা নির্ধারিত নিয়ম মেনে ম’\দ গ্রহণ করতে পারবেন। তবে পারমিট ছাড়া গণহারে ম’\দ বিক্রি কিংবা লাইসেন্সের বাইরে কেনাবেচা করা হলে তা অবশ্যই অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
তিন শ্রেণিতে মা’\দকের বিভাজন
আইনে প্রচলিত মা’\দক ও সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক উপকরণগুলোকে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে।
‘ক’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে পপি গাছ, আ’\ফিম, কো’\কেন, হে’\রোইন, মর’\ফিনসহ মনোদৈহিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী বিভিন্ন মারাত্মক রাসায়নিক দ্রব্য।
‘খ’ শ্রেণির মধ্যে রয়েছে গাঁ’\জা, ভা’\ঙ, সিডি এবং শূন্য দশমিক ২ শতাংশের বেশি অ্যালকোহলযুক্ত ওয়াইন, বিয়ার, চোলাইম’\দ অথবা অন্যান্য নেশাজাতীয় উপকরণ।
‘গ’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে মিথানল, স্পিরিট, তাঁড়ি ও পঁচুইসহ মানুষের খাওয়ার অনুপযুক্ত বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক তরল।
সূত্র: বিবিসি বাংলা (BBC Bangla)
