‘আমেরিকা ফার্স্ট’ থেকে বৈশ্বিক লেনদেন—ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ঘিরে নতুন বিতর্ক

‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে আমেরিকা’—এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় ফিরেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। তবে তার দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রকে গণতন্ত্র বা উদারনৈতিক মূল্যবোধের নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং সর্বোচ্চ আর্থিক সুবিধা আদায়ে আগ্রহী একটি বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।

‘ট্রাম্প ২.০’ পররাষ্ট্রনীতিতে মিত্র ও প্রতিপক্ষ—উভয় পক্ষের কাছ থেকেই অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়, শুল্ক আরোপ, সম্পদের অংশীদারত্ব কিংবা মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড, কানাডা ও পানামা খাল ঘিরেও তার সম্প্রসারণবাদী অবস্থান আলোচনায় এসেছে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই মেক্সিকো সীমান্ত দেয়াল নির্মাণের ব্যয় বহন করতে অস্বীকৃতি জানালে তার পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছিল। তবুও তার দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক প্রভাব এমন এক সম্পদ, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় সম্ভব।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিনি হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী কার্গো জাহাজকে মার্কিন নিরাপত্তা দেওয়ার বিনিময়ে ২০ শতাংশ টোল আরোপের প্রস্তাব দেন। পরে অবশ্য সেই অবস্থান থেকে সরে এসে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প জানান, মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর ২০ শতাংশ ‘ইউনাইটেড স্টেটস রিইম্বারসমেন্ট ফি’ আদায়ের পরিবর্তে উপসাগরীয় দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ট্রাম্প বোঝাতে চাইছেন যে বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততার বিনিময়ে দেশটির অর্থনৈতিক লাভ নিশ্চিত করা উচিত।

পেন্টাগন ইরান সংঘাতের ব্যয়ের আনুষ্ঠানিক হিসাব প্রকাশ না করলেও বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থার মতে, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ইতোমধ্যে ৪০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। পাশাপাশি জ্বালানির দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মার্কিন নাগরিকও এর অর্থনৈতিক প্রভাব অনুভব করছেন।

কানাডার সঙ্গে সেতু নিয়েও টানাপোড়েন

গত ফেব্রুয়ারিতে কানাডার অর্থায়নে নির্মিত গর্ডি হাউ ব্রিজের মালিকানা ভাগাভাগির দাবি তুলে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন জটিলতা তৈরি করেন ট্রাম্প।

এর ফলে সেতুর উদ্বোধন পিছিয়ে যায়। পরে সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়, আগামী ১৫ বছরের টোল থেকে প্রাপ্ত নিট মুনাফার একটি অংশ একটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন তহবিলের মাধ্যমে ভাগাভাগি করা হবে। তবে এর বিস্তারিত কাঠামো এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি (Mark Carney) বলেন, কানাডার নির্মাণ ব্যয় উঠে আসার পরই কেবল নিট মুনাফা ভাগাভাগি করা হবে। তার ভাষায়, ব্যয় সমন্বয়ের পর ভাগ করার মতো খুব বেশি মুনাফা অবশিষ্ট থাকার সম্ভাবনা নেই।

বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে ট্রাম্পের দাবি প্রশ্নের মুখে

ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, তার প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯ ট্রিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছে।

তবে বিভিন্ন অনুসন্ধানে এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প নিয়মিত এই পরিসংখ্যান ব্যবহার করলেও তার পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

শুল্ক নীতি ও আইনি জটিলতা

ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল আমদানিকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব শুল্কের প্রকৃত বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই বর্তায়। যদিও ট্রাম্প বরাবরই দাবি করে এসেছেন, বিদেশি দেশগুলোই এসব শুল্ক পরিশোধ করে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট (U.S. Supreme Court) চলতি বছর রায় দিয়েছে যে সরকারের আরোপিত কিছু শুল্ক আইনসম্মত ছিল না। এর পরিপ্রেক্ষিতে জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রায় ৪৯ বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিদের করা মামলার সংখ্যাও বাড়ছে।

ভেনিজুয়েলা নীতি নিয়ে প্রশ্ন

ট্রাম্প প্রশাসনের ভেনিজুয়েলা (Venezuela) নীতিও সমালোচনার মুখে রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বিচারের মুখোমুখি করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও দেশটির বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোর বড় অংশ বহাল রয়েছে এবং তেল বিক্রির নিয়ন্ত্রণও তাদের মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে।

বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া করিনা মাচাদোকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি এলিয়ট আব্রামস মন্তব্য করেছেন, গণতান্ত্রিক সংস্কারের পরিবর্তে তেল উৎপাদন ও বিনিয়োগের ওপর জোর দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী নীতি হতে পারে।

ইউক্রেনের রেয়ার আর্থ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ

সম্প্রতি ন্যাটো (NATO) সম্মেলনে ট্রাম্প ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর উৎপাদন ও লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অংশীদারত্ব’ রয়েছে, কারণ দেশটিতে মূল্যবান খনিজ ও রেয়ার আর্থ সম্পদের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ইউক্রেন বরাবরই তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের পূর্ণ মালিকানা নিজেদের বলে দাবি করে আসছে।

ন্যাটোতে নতুন সমীকরণ

ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনা নতুন নয়। তার অভিযোগ, ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তায় যথেষ্ট ব্যয় না করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প সফল হলেও এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপের যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।

ট্রাম্পের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিতর্ক যতই বাড়ুক না কেন, একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আদর্শিক নয়, বরং আর্থিক লাভ-ক্ষতির হিসাবেই মূল্যায়ন করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। আর সেই দৃষ্টিভঙ্গিই বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।