বাবরের দীর্ঘ সিজদা দেখে মুগ্ধ মাবরুর, স্মৃতিচারণায় উঠে এলো ১৭ বছরের কারাজীবন

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (Bangladesh Nationalist Party) ভাইস চেয়ারম্যান লুৎফুজ্জামান বাবরকে (Lutfozzaman Babar) নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আবেগঘন একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদের (Ali Ahsan Mohammad Mujahid) ছেলে আলী আহমাদ মাবরুর (Ali Ahmad Mabrur)।

নিজের স্ট্যাটাসে তিনি বিএনপির সংসদ সদস্য বাবরের নামাজ ও দীর্ঘ সিজদা দেখে মুগ্ধ হওয়ার কথা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে স্মরণ করেছেন আদালতকেন্দ্রিক অতীতের নানা ঘটনা এবং দুই পরিবারের পুরোনো স্মৃতি।

নামাজ ও সিজদার প্রসঙ্গ উঠতেই সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন লুৎফুজ্জামান বাবর। মাবরুরের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবর তাকে বলেন, ‘যদি পারতাম সারা দিন সিজদা দিয়ে থাকতাম। আমার তো ইচ্ছে করে সিজদা থেকে মাথা না তুলি। আমার আল্লাহ আমাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে এসেছেন। মৃ’\ত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। অপমানের জীবন থেকে আজকের জায়গায় এনেছেন। ১৭ বছর কারাগার আর কনডেম সেলের জীবন থেকে আবার সংসদে এনেছেন। আমি যদি সারাদিন সিজদা দিয়ে থাকি, তাহলেও তো আল্লাহর শুকরিয়ার কিছুই আদায় করা হবে না।’

সংসদ ভবনের মসজিদে হঠাৎ দেখা

এ-সংক্রান্ত ফেসবুক স্ট্যাটাসে আলী আহমাদ মাবরুর লিখেছেন, ‘সংসদের গত অধিবেশন চলাকালীন একটি স্মৃতি। সংসদ ভবনের মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করতে গিয়েছি। ফরজ ও সুন্নাত পড়ে আর সবার মতো আমিও বের হচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল একজন মানুষ সিজদা দিয়ে রয়েছেন। ২-৩ মিনিট তো হবেই।’

তিনি লিখেছেন, ওই ব্যক্তি নফল নামাজ পড়ছিলেন এবং একটানা দীর্ঘ সময় সিজদায় ছিলেন। ভালো করে তাকিয়ে তিনি দেখতে পান, মানুষটি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর।

মাবরুরের ভাষায়, ‘আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। ওনাকে ওখানে পাব, এমন কোনো ধারণা ছিল না। তাই কথা বলার প্ল্যানও ছিল না। কিন্তু এভাবে কয়েক মিনিট ধরে সিজদা দেওয়ার দৃশ্য দেখে হুট করেই কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলাম।’

বাবর বারবার সালাম ফিরিয়ে আবার নামাজে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ফলে নামাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মাবরুর অপেক্ষা করেন। একপর্যায়ে বাবরের নামাজ শেষ হয়েছে বুঝতে পেরে তিনি ধীরে গিয়ে তার পাশে বসেন।

মাবরুর লিখেছেন, ‘বললাম, একটু কথা বলতে চাই। তিনি বললেন, “বলেন না, কী বলবেন।”’

আদালতের পুরোনো স্মৃতি ও আবেগঘন আলিঙ্গন

ফেসবুক পোস্টে মাবরুর বলেন, ‘আমি বললাম, আমি আপনাকে বাবর বহুদিন ধরে দেখেছি কোর্টে আনা-নেওয়া করতে। আপনার কি আমার চেহারা মনে পড়ে? তিনি বললেন, চেনা তো মনে হয়।’

এরপর মাবরুর নিজের বাবা আলী আহসান মুজাহিদের পরিচয় দেন। তিনি বাবরকে জানান, ২১ আগস্ট মামলায় বাবর ও তার বাবা দুজনই সহ-আসামি ছিলেন। ওই মামলার কার্যক্রম চলাকালে তিনি সারা দিন আদালতের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। যেদিন আদালত অনুমতি দিতেন, সেদিন ভেতরে গিয়ে বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন।

তিনি বাবরকে আরও স্মরণ করিয়ে দেন, সে সময় তাদের বহুবার দেখা হয়েছে। এমনকি সবাই মিলে খাবার ভাগাভাগি করেও খেয়েছেন।

মাবরুর লিখেছেন, কথাগুলো শোনার পর বসা অবস্থাতেই বাবর তাকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি বলেন, ‘তুমি মুজাহিদ সাহেবের ছেলে। তোমরা কেমন আছো? আমি তোমার বাবার খুব ক্লোজ ছিলাম।’

এরপর বাবর আরও অনেক কথা বলেন এবং একপর্যায়ে রীতিমতো আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন বলে স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন মাবরুর।

‘সিজদা থেকে মাথা তুলতে ইচ্ছে করে না’

সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবরের দীর্ঘ সিজদার বিষয়েও তাকে প্রশ্ন করেছিলেন আলী আহমাদ মাবরুর। প্রশ্নের জবাবে বাবর নিজের জীবনের পরিবর্তন এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।

মাবরুরের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবর বলেন, ‘আংকেল, যদি পারতাম সারা দিন সিজদা দিয়ে থাকতাম। আমার তো ইচ্ছে করে সিজদা থেকে মাথা না তুলি। আমার আল্লাহ আমাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে এসেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘মৃ’\ত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। অপমানের জীবন থেকে আজকের জায়গায় এনেছেন। ১৭ বছর কারাগার আর কনডেম সেলের জীবন থেকে আবার সংসদে এনেছেন। আমি যদি সারাদিন সিজদা দিয়ে থাকি, তাহলেও তো আল্লাহর শুকরিয়ার কিছুই আদায় করা হবে না।’

বাবরের এ বক্তব্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভঙ্গি নিজের মন ছুঁয়ে গেছে বলে জানান মাবরুর। তিনি লিখেছেন, ‘সেদিন তার সিজদা দেখে, তার শুকরিয়া আদায়ের ভঙ্গিমা দেখে এবং তার বিনয় দেখে ভালো লাগল।’

তার মতে, আল্লাহ আরও অনেক মানুষকেই অত্যন্ত খারাপ অবস্থা থেকে ভালো অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু সবাই বাবরের মতো করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে পারেন না। কেউ কেউ এরই মধ্যে নিজেদের অতীতও ভুলে গেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

‘মজলুম পরিবার তোমরা, ভালো থেকো’

ফেসবুক স্ট্যাটাসের শেষ অংশে বাবরের সঙ্গে ছবি তোলার ঘটনাও তুলে ধরেন আলী আহমাদ মাবরুর। তিনি লিখেছেন, মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর অনেক মানুষকে বাবরের সঙ্গে ছবি তুলতে দেখেন।

এ ধরনের জায়গায় ছবি তোলার ক্ষেত্রে নিজের মধ্যে বরাবরই একধরনের আড়ষ্টতা কাজ করে জানিয়ে মাবরুর বলেন, সেদিন তার ভেতরে যেন অন্যরকম অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। তাই তিনি নিজেই বাবরের সঙ্গে একটি ছবি তুলে স্মৃতিটি ধরে রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

মাবরুর লিখেছেন, ‘নিজেই বললাম, আপনার সঙ্গে একটি স্মৃতি ধরে রাখি।’

তার অনুরোধ শুনে বাবর বলেন, ‘আমার আংকেলের সঙ্গে তো আমিই ছবি তুলব। মজলুম পরিবার তোমরা। ভালো থেকো।’

বাবরের এই শেষ কথা ও দোয়া নিয়েই সেদিন সেখান থেকে চলে আসেন বলে আবেগঘন স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন আলী আহমাদ মাবরুর।