স্পেনের দ্বিতীয় ফিফা বিশ্বকাপ জয় শুধু একটি শিরোপা অর্জনের গল্প নয়, এটি রেকর্ড ভাঙা-গড়ারও এক অনন্য অধ্যায়। ২০১০ সালের পর আবারও বিশ্বকাপ জিতে স্পেন ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে এবং একাধিকবার বিশ্বকাপ জয়ী সপ্তম দেশ হিসেবে নিজেদের নাম লিখিয়েছে।
ইউরো থেকে বিশ্বকাপ, স্পেনের ঐতিহাসিক যাত্রা
-
ইউরো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি ফুটবল বিশ্বে এটি মাত্র তৃতীয়বার। এর আগে ১৯৭২-৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি এবং ২০০৮-১০ সালের স্পেন এই অর্জন করেছিল।
-
ফেরান তোরেস (Ferran Torres) ফাইনালে গোল করে বিশ্বকাপে নিজের তৃতীয় গোলের দেখা পান। এবারের আসরে এটি ছিল তাঁর প্রথম গোল। এর আগে ২০২২ বিশ্বকাপে কোস্টারিকার বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন।
-
ম্যাচের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলটি বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে অতিরিক্ত সময়ে করা তৃতীয় জয়সূচক গোল। এর আগে ২০১০ সালে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা এবং ২০১৪ সালে মারিও গোটসে একই কীর্তি গড়েছিলেন। পাশাপাশি গোটসের পর বদলি হিসেবে নেমে বিশ্বকাপ ফাইনালে জয়সূচক গোল করা দ্বিতীয় ফুটবলারও তোরেস।
রক্ষণে দুর্ভেদ্য স্পেন
-
পুরো টুর্নামেন্টে স্পেন সাতটি ক্লিন শিট রেখে এক আসরে সর্বোচ্চ ক্লিন শিটের নতুন রেকর্ড গড়েছে।
-
পুরো বিশ্বকাপে তারা মাত্র একটি গোল হজম করেছে, সেটিও বেলজিয়ামের চার্লস ডি কেতেলারের বিপক্ষে। এটি বিশ্বকাপজয়ী কোনো দলের সর্বনিম্ন গোল হজমের নতুন রেকর্ড। এর আগে ২০০৬ সালে সুইজারল্যান্ড পুরো আসরে গোল না খেলেও শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিয়েছিল।
-
সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে স্পেন এখন টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত। এর মাধ্যমে ২০১৮-২১ সময়ে ইতালির গড়া ৩৭ ম্যাচের অপরাজিত থাকার রেকর্ড ভেঙেছে তারা।
-
এখন পর্যন্ত সাতটি বড় টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলেছে স্পেন। এর মধ্যে ছয়টিতেই জয় পেয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে কেবল জার্মানির সাতটি বড় শিরোপা রয়েছে, যা এখনো সর্বোচ্চ।
কোচ ও তরুণদের অনন্য অর্জন
-
লুইস দে লা ফুয়েন্তে (Luis de la Fuente) ৬৫ বছর ২৯ দিন বয়সে বিশ্বকাপজয়ী ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সী কোচ হয়েছেন।
-
বড় টুর্নামেন্টে (বিশ্বকাপ ও ইউরো) তাঁর টানা ১৫ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড ইতিহাসের সেরা সূচনা।
-
বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে শেষ ১৫ ম্যাচের মধ্যে ১৪টিতেই জয় পেয়েছে স্পেন। একমাত্র কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করেছে তারা।
-
লামিনে ইয়ামাল (Lamine Yamal) ১৯ বছর ৬ দিন বয়সে বিশ্বকাপজয়ী ইতিহাসের যৌথভাবে চতুর্থ সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার। পাও কুবার্সি সপ্তম সর্বকনিষ্ঠ।
-
ইয়ামাল বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার। তাঁর আগে রয়েছেন পেলে (১৯৫৮) এবং জিউসেপ্পে বার্গোমি (১৯৮২)।
-
ইতিহাসের প্রথম টিনএজার হিসেবে ইউরো ও ফিফা বিশ্বকাপ—দুটি শিরোপাই জিতেছেন লামিনে ইয়ামাল।
-
ফ্যাবিয়ান রুইস (Fabian Ruiz) একই মৌসুমে বিশ্বকাপ ও উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা ইতিহাসের মাত্র দশম ফুটবলার।
-
পাও কুবার্সি ফাইনালে ১২১টি সফল পাস দিয়েছেন, যা গত ৬০ বছরের বিশ্বকাপ ফাইনালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
ব্যক্তিগত পুরস্কারে স্পেনের দাপট
-
রদ্রি প্রথম স্প্যানিশ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল জিতেছেন।
-
পাও কুবার্সি প্রথম স্প্যানিশ হিসেবে সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছেন।
-
উনাই সিমন দ্বিতীয় স্প্যানিশ গোলরক্ষক হিসেবে গোল্ডেন গ্লাভ জিতেছেন।
-
১৯৯৪ সালে ব্রাজিলের রোমারিওর পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপজয়ী দলের কোনো খেলোয়াড় গোল্ডেন বল জিতলেন। ৩২ বছর পর এই কীর্তি গড়লেন রদ্রি।
আর্জেন্টিনার হতাশার রাত
-
গত চার আসরে যে দল বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে, তারা পরের আসরে রানার্সআপ হয়েছে। সেই তালিকায় যুক্ত হলো ২০২৬ সালের আর্জেন্টিনা। এর আগে ছিল আর্জেন্টিনা (১৯৯০), ব্রাজিল (১৯৯৮) ও ফ্রান্স (২০২২)।
-
শেষ চার বিশ্বকাপ ফাইনালের মধ্যে তিনটিতেই রানার্সআপ হয়েছে আর্জেন্টিনা।
-
বিশ্বকাপে টানা ১৩ ম্যাচ অপরাজিত থাকার ধারাও ভেঙেছে আর্জেন্টিনার। ২০২২ সালে সৌদি আরবের বিপক্ষে হারের পর এটিই তাদের প্রথম বিশ্বকাপ পরাজয়।
-
গত ৬০ বছরের মধ্যে প্রথমবার কোনো বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা লক্ষ্যে একটিও শট রাখতে পারেনি। ১৯৯০, ২০১৪ ও ২০২৬—এই তিন ফাইনালেই এমন ঘটনা ঘটেছে।
মেসির অনন্য মাইলফলক
-
লিওনেল মেসি (Lionel Messi) বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার, যিনি তিনটি ফাইনালে শুরুর একাদশে খেলেছেন।
-
ব্রাজিলের কাফুর পর দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছেন তিনি এবং ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে অধিনায়কত্ব করেছেন।
-
৩৯ বছর ২৫ দিন বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সী আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে শুরুর একাদশে নেমেছেন মেসি।
-
এই ফাইনালে মেসি ও ইয়ামালের বয়সের ব্যবধান ছিল ২০ বছর ১৯ দিন, যা বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে শুরুর একাদশে থাকা দুই খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
-
ফাইনালে মেসি ৫৪ বার বল স্পর্শ করেছেন, যা তাঁর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের শুরুর একাদশের ম্যাচগুলোর মধ্যে পঞ্চম সর্বনিম্ন।
আরও উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান
-
এমিলিয়ানো মার্তিনেজ স্পেনের বিপক্ষে ১১টি সেভ করেছেন, যা গত ৬০ বছরের বিশ্বকাপ ফাইনালের সর্বোচ্চ।
-
এনজো ফার্নান্দেজ বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে লাল কার্ড দেখা ষষ্ঠ ফুটবলার। ২০১০ সালের পর তিনিই প্রথম।
-
কিলিয়ান এমবাপ্পে ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার, যিনি দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে (২০২২ ও ২০২৬) গোল্ডেন বুট জিতেছেন।


