তুরস্কের প্রধান শহর ইস্তাম্বুল (Istanbul)-এর গণপরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইস্তাম্বুল মেট্রো। আধুনিক ও দ্রুতগতির এই রেলব্যবস্থা শহরের ইউরোপীয় এবং এশীয়—দুই অংশজুড়েই বিস্তৃত। বর্তমানে নেটওয়ার্কটিতে ১১টি সক্রিয় মেট্রো লাইন রয়েছে, যেগুলো মারমারে কমিউটার রেল, ট্রাম ও ফানিকুলার লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত।
শহরের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন মাইলফলক যুক্ত করে চালু হয়েছে এম১১ মেট্রো লাইনের শেষ অংশ। নতুন এই অংশের মাধ্যমে আরনাভুতকয়কে হালকালির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ রুটটি ইস্তাম্বুলের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের যাতায়াতব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।
ইস্তাম্বুলের পাতাল রেলের ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। এর সূচনা হয়েছিল ১৮৭৫ সালে চালু হওয়া বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম পাতাল ট্রেন ‘তুনেল’-এর মাধ্যমে। তবে শহরটির আধুনিক মেট্রো নেটওয়ার্কের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে। সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হওয়া এই ব্যবস্থা এখন বসফরাস প্রণালির দুই পাশে থাকা এশিয়া ও ইউরোপকে একই পরিবহন নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে এসেছে।
বর্তমানে ইস্তাম্বুলে ১১টি প্রধান মেট্রো লাইন এবং শত শত স্টেশন রয়েছে। প্রতিদিন লাখ লাখ যাত্রী এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে শহরের তীব্র যানজট এড়িয়ে তুলনামূলক দ্রুত ও সহজে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। ইউরোপ ও এশিয়াকে যুক্ত করা এই মেট্রোব্যবস্থা বিশ্বের দীর্ঘ দ্রুতগতির নগর পরিবহন নেটওয়ার্কগুলোর অন্যতম হিসেবেও পরিচিত।
সর্বশেষ সম্প্রসারণের ফলে ইস্তাম্বুলের পরিবহনব্যবস্থায় নতুন গতি এসেছে। নতুন যুক্ত হওয়া ১৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশে আরনাভুতকয় হাসতানে থেকে হালকালি পর্যন্ত যাত্রী চলাচল শুরু হয়েছে।
এই সম্প্রসারিত অংশে হালকালি, অলিম্পিয়াতকয়, কায়াশেহির, ইবন খালদুন ইউনিভার্সিটি এবং আরনাভুতকয় হাসতানের মতো নতুন স্টেশন যুক্ত হয়েছে। ফলে শহরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সরাসরি মেট্রো নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে।
নতুন রুটে যাত্রীদের অভ্যস্ত করে তুলতে হালকালি-আরনাভুতকয় অংশে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনা ভাড়ায় যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন এই সংযোগের মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন অংশকে বিমানবন্দর এবং হাইস্পিড রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা হয়েছে।
এম১১ মেট্রো লাইন (M11 Metro Line) ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর থেকে গায়রেত্তেপে পর্যন্ত সরাসরি যাত্রী পরিবহন করে। এর সর্বশেষ সম্প্রসারণ হিসেবেই হালকালি পর্যন্ত নতুন অংশ চালু করা হয়েছে। এই সংযোগ চালুর ফলে বিমানবন্দরমুখী যাত্রীদের জন্য শহরের আরও বিস্তৃত এলাকা থেকে সরাসরি ও দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ঐতিহাসিক ফাতিহ জেলা, সুলতানাহমেত ও হাগিয়া সোফিয়া থেকে শুরু করে তাকসিম স্কয়ার এবং বসফরাসের তীরবর্তী এলাকায় চলাচলের জন্য এম২ লাইনটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। শহরের পর্যটনকেন্দ্রিক এবং ব্যস্ত এলাকাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগে এই লাইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মারমারে (Marmaray) টানেলের মাধ্যমে বসফরাস প্রণালির নিচ দিয়ে যাত্রীরা সরাসরি ইউরোপ থেকে এশিয়ায় এবং এশিয়া থেকে ইউরোপে যাতায়াত করতে পারেন। অন্যদিকে ইস্তাম্বুলের এশীয় অংশের যাত্রীদের জন্য কাদিকয় থেকে সাবিহা গোকচেন বিমানবন্দর পর্যন্ত চলাচলকারী এম৪ লাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইস্তাম্বুলের মেট্রো, ট্রাম ও ফেরিতে ভ্রমণের জন্য ‘ইস্তাম্বুলকার্ট’ নামের একটি ইলেকট্রনিক কার্ড ব্যবহার করতে হয়। একই কার্ড শহরের বিভিন্ন গণপরিবহনে ব্যবহার করা যায়। ফলে আলাদা আলাদা পরিবহনের জন্য পৃথক টিকিট সংগ্রহের প্রয়োজন পড়ে না।
অধিকাংশ মেট্রো লাইন সাধারণত সকাল ৬টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলাচল করে। তবে নির্দিষ্ট কয়েকটি লাইনে সপ্তাহের ছুটির দিনে ২৪ ঘণ্টা মেট্রোসেবা চালু থাকে। এর ফলে রাতের বেলায়ও শহরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ রুটে যাত্রী চলাচল অব্যাহত থাকে।
ইস্তাম্বুলের পাতাল রেল ব্যবস্থার ঐতিহাসিক যাত্রা
ইস্তাম্বুলের প্রথম ভূগর্ভস্থ রেলব্যবস্থা ‘তুনেল’ চালু হয় ১৮৭৫ সালে। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম সাবওয়ে হিসেবে পরিচিত। ফরাসি প্রকৌশলী ইউজিন গ্যালান এটি নির্মাণ করেন। মূলত এটি একটি ভূগর্ভস্থ ফানিকুলার ব্যবস্থা, যা কারাকোয় ও বেয়োগ্লুকে সংযুক্ত করে।
চালুর শুরুর দিকে তুনেল বাষ্পীয় ইঞ্জিনে পরিচালিত হতো। পরে ১৯১১ সালে ব্যবস্থাটিকে বিদ্যুতায়িত করা হয়। ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি আজও এটি ইস্তাম্বুলের পরিবহন ঐতিহ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে আছে।
আধুনিক ইস্তাম্বুল মেট্রোর প্রথম লাইন এম১ চালু হয় ১৯৮৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। এর মধ্য দিয়েই শহরটির আধুনিক মেট্রো যুগের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। এরপর ২০০০ সালে প্রথম আধুনিক ভূগর্ভস্থ মেট্রো লাইন এম২ যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
ইস্তাম্বুলের মেট্রো ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি আসে ২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর। ওই দিন মারমারে টানেল (Marmaray Tunnel) উদ্বোধন করা হয়। বসফরাস প্রণালির তলদেশ দিয়ে নির্মিত এই লাইন এশিয়া ও ইউরোপকে সরাসরি রেলপথে যুক্ত করেছে।
মারমারে চালুর ফলে ইস্তাম্বুলের দুই মহাদেশীয় অংশের মধ্যে মাত্র কয়েক মিনিটে যাতায়াত সম্ভব হয়। এর আগে সড়কপথ ও ফেরির ওপর নির্ভরতা বেশি থাকলেও টানেলটি চালু হওয়ার পর নগর পরিবহনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা ঘটে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইস্তাম্বুলের মেট্রো নেটওয়ার্ক ধারাবাহিকভাবে আরও বিস্তৃত হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর (Istanbul Airport) পর্যন্ত এম১১ লাইন চালু করা হয়। এখন হালকালি পর্যন্ত এর নতুন অংশ যুক্ত হওয়ায় শহরের বিমানবন্দর, আবাসিক এলাকা এবং রেল নেটওয়ার্কের মধ্যে যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হয়েছে।
২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, শহরজুড়ে ইস্তাম্বুল মেট্রো বর্তমানে ১১টি রুটে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শতাধিক স্টেশন ও একাধিক সংযোগব্যবস্থার মাধ্যমে এই নেটওয়ার্ক প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রীর চলাচল সহজ করছে। ঐতিহাসিক তুনেল থেকে শুরু করে আধুনিক এম১১—দীর্ঘ এই যাত্রায় ইস্তাম্বুলের মেট্রো এখন একই সঙ্গে শহরটির অতীত, বর্তমান এবং ক্রমবর্ধমান যোগাযোগব্যবস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।


