বিকেলে বা’বাকে দাফন, রাতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন, আর পরদিন সকালে এইচএসসি পরীক্ষার হলে বসা—বাগেরহাটের শিক্ষার্থী ইকনের জীবনসংগ্রামের এই গল্প দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। সেই ঘটনার পর এবার তার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম ড. এহছানুল হক মিলন।
বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) ফারহান ইশতিয়াক (Farhan Ishtiaq) ফোনে ইকনের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে শিক্ষামন্ত্রী নিজেই ইকনের সঙ্গে কথা বলবেন। একই সঙ্গে ইকনের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন বিবেচনায় দ্রুত আর্থিক সহায়তা পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী। শুধু তাই নয়, এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ইকনের উচ্চশিক্ষাসহ ভবিষ্যতের লেখাপড়ার সার্বিক দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রীর পিএস ফারহান ইশতিয়াক বলেন, ইকনের বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং মন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি দেখছেন। আপাতত তার জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে অর্থের অভাবে যাতে তার পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
সংবাদটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইকনের জীবনসংগ্রামের গল্প ব্যাপক সাড়া ফেলে। দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ তার খোঁজখবর নেন এবং সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষামন্ত্রীর এই মানবিক উদ্যোগ ইকন ও তার পরিবারের জন্য নতুন আশার বার্তা হয়ে এসেছে।
ঘটনার দিন সকালে ইকনের বা’বা ইসরাফিল দাড়িয়া (Israfil Daria) হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে দুপুরে তিনি মা’\রা যান। মাত্র ৪৬ বছর বয়সে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে পরিবারটি।
জীবিকার তাগিদে মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসার চালাতেন ইসরাফিল দাড়িয়া। ইকনের দাদার বাড়ি গোপালগঞ্জে হলেও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (Bangladesh Water Development Board)-এ গাড়িচালকের চাকরির সুবাদে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে বাগেরহাট (Bagerhat)-এ বসবাস করছে। চাকরি থেকে অবসরের পর দাদা গোপালগঞ্জে ফিরে গেলেও ইসরাফিল বাগেরহাটেই থেকে যান।
বর্তমানে মা, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারানো এক ভাই এবং নিজেকে নিয়ে মাত্র চার হাজার টাকা ভাড়ার একটি বাসায় বসবাস করছে ইকনের পরিবার।
ইকনের বড় মামা মানিক মোল্লা বলেন, এটি তাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত কঠিন সময়। বা’বার মৃ’\ত্যুর পর পরিবারের সব দায়িত্ব যেন হঠাৎ করেই ইকনের কাঁধে এসে পড়েছে। কিন্তু এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সে পড়াশোনা ছাড়েনি। শিক্ষামন্ত্রী তার লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
ইকন জানান, অর্থের অভাবে এ বছর প্রয়োজনীয় বইও কিনতে পারেননি তিনি। নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে কোরিয়ান ও চীনা ভাষাও শিখেছেন, যাতে ভবিষ্যতে ভালো কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ পান।
তিনি বলেন, তার ভাই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। মা তাকে দেখাশোনা করেন। সংসারে বা’বাই ছিলেন একমাত্র উপার্জনকারী। বা’বার ওপর চাপ কমানোর জন্যই তিনি আট হাজার টাকা বেতনে এটিএম বুথে চাকরি নিয়েছিলেন। অর্থের অভাবে এ বছর নিজের বইও কিনতে পারেননি। ভবিষ্যতের কথা ভেবে কোরিয়ান ও চীনা ভাষাও শিখেছেন, কারণ নিজের ভাগ্য নিজেকেই গড়ে নিতে হবে।
ইকন আরও বলেন, তিনি কখনো ভাবেননি তার জীবনের গল্প এভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা তাকে নতুন করে সাহস জুগিয়েছে। যারা তার সংগ্রামের গল্প মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন এবং যারা পাশে দাঁড়িয়েছেন, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, তিনি সবার দোয়া চান, যেন লেখাপড়া শেষ করে একজন ভালো মানুষ হতে পারেন এবং পরিবারের দায়িত্ব নিতে সক্ষম হন।
