সাদুল্যাপুরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখায় কোটি টাকার আমানত নিয়ে অনিশ্চয়তা

গাইবান্ধার (Gaibandha) সাদুল্যাপুরে (Sadullapur) ইসলামী ব্যাংকের একটি এজেন্ট শাখায় গ্রাহকদের জমা রাখা প্রায় কোটি টাকার সঠিক হিসাব মিলছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। আমানতকারীদের দাবি, নির্ধারিত মুনাফার অর্থ তো দূরের কথা, অনেকেই তাদের জমা দেওয়া মূলধনের সঠিক হিসাবও পাচ্ছেন না। এতে বেশ কয়েকজন গ্রাহকের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর রোববার রাত ১০টা পর্যন্ত উপজেলার ধাপেরহাট এলাকায় অবস্থিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ (Islami Bank Bangladesh)-এর এজেন্ট শাখাটিতে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা নিয়ে ভিড় করেন গ্রাহকেরা। তারা দ্রুত ঘটনার তদন্ত, জমা অর্থের প্রকৃত হিসাব প্রকাশ এবং আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি জানান।

গ্রাহকদের অভিযোগ, শাখাটিতে নিয়মিত টাকা জমা দেওয়ার পর তাদের হাতে রসিদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরে ব্যাংকের হিসাব বিবরণী যাচাই করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, রসিদে উল্লেখ থাকা জমার অর্থের সঙ্গে অফিসের নথির মিল নেই। কোনো কোনো গ্রাহক জমার রসিদ দেখাতে পারলেও ব্যাংক হিসাবে সেই টাকার কোনো তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করেছেন তারা।

এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছেন ধাপেরহাট ইউনিয়নের (Dhaperhat Union) হাসানপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সোলেমান সরকার। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে প্রতি মাসে ওই এজেন্ট শাখায় আমানত হিসেবে টাকা জমা দিয়ে আসছেন। কিন্তু ব্যাংকের নথিতে তার জমা দেওয়া অর্থের সঠিক হিসাব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

সোলেমান সরকার বলেন, ‘আমি প্রতি মাসে ব্যাংকে আমানত হিসেবে টাকা জমা রাখছি। বিকেলে বিষয়টি শোনার পর থেকেই ব্যাংকে অবস্থান করছি। ব্যাংকে যে টাকা জমা দিয়েছি, অফিসের কাগজের সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। আমার মতো আরও অনেক গ্রাহকের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছে।’

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি জানার পর তিনি শাখায় এসে নিজের জমা অর্থের হিসাব যাচাই করতে চান। কিন্তু তার কাছে থাকা রসিদ এবং ব্যাংক কার্যালয়ের কাগজপত্রের মধ্যে অসংগতি দেখতে পান। একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন আরও কয়েকজন আমানতকারী।

ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে শাখাটির সামনে গ্রাহকদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। কেউ নিজের হিসাব যাচাই করতে আসেন, কেউ আবার জমা রাখা টাকার নিরাপত্তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট বক্তব্য জানতে চান। রাত পর্যন্ত শাখাটির সামনে অবস্থান করা গ্রাহকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা যায়।

অনেক গ্রাহক জানিয়েছেন, ভবিষ্যতের প্রয়োজন, পারিবারিক ব্যয় কিংবা জরুরি পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে তারা ওই এজেন্ট শাখায় নিয়মিত টাকা জমা রেখেছিলেন। এখন হিসাব বিবরণীতে জমা অর্থের তথ্য না পাওয়ায় তাদের মধ্যে অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তাদের অভিযোগ, এজেন্ট শাখায় জমা দেওয়ার সময় তারা নিয়ম অনুযায়ী রসিদ গ্রহণ করেছেন। ফলে ব্যাংকের নথিতে অর্থের হিসাব না থাকার বিষয়টি কীভাবে ঘটল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। প্রকৃতপক্ষে কতজন গ্রাহকের কত টাকা হিসাবে নেই, সেটিও এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসলামী ব্যাংকের গাইবান্ধা শাখার (Islami Bank Gaibandha Branch) একজন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি জানাজানির পরই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করেছে। গ্রাহকদের জমা অর্থ, রসিদ এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবের নথি যাচাই করে প্রকৃত তথ্য বের করার চেষ্টা চলছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি জানাজানির পরই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রকৃত হিসাব যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

ব্যাংক কর্মকর্তার এমন বক্তব্যের পরও গ্রাহকদের উদ্বেগ কাটেনি। তারা বলছেন, তদন্তের পাশাপাশি দ্রুত তাদের প্রত্যেকের হিসাব যাচাই করে জমা দেওয়া অর্থের সঠিক তথ্য জানাতে হবে। যাদের অর্থ ব্যাংকের মূল হিসাবে জমা হয়নি, তাদের টাকা ফেরতেরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

ঘটনার পর থেকে ধাপেরহাট এলাকার গ্রাহক ও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নিয়মিত টাকা জমা দেওয়ার পরও ব্যাংকের হিসাব বিবরণীতে সেই অর্থ না থাকলে এর দায় কার, কীভাবে এত বড় অঙ্কের টাকার হিসাব মিলছে না এবং এ ঘটনায় কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের দ্রুত উত্তর চান তারা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, বিষয়টি দীর্ঘায়িত হলে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তাই কোনো ধরনের বিলম্ব না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন করা প্রয়োজন।

দ্রুত তদন্ত শেষ করে গ্রাহকদের জমা অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ, ঘটনায় জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।