দিল্লির যন্তর মন্তর (Jantar Mantar) এবং আরও কয়েকটি শহরে সদ্য সমাপ্ত আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত ভাষা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নিয়ে এরই মধ্যে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। আন্দোলনের পোস্টার, প্ল্যাকার্ড, স্লোগান ও মিমে যেমন সৃজনশীলতা ও রসবোধ দেখা গেছে, তেমনি কখনও কখনও অশ্লীলতা ও আপত্তিকর ভাষার প্রকাশও ঘটেছে।
এবার সেই জেন জি আন্দোলনকারীদের নিয়ে বিতর্কিত ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন অভিনেত্রী ও বিজেপি (Bharatiya Janata Party) সংসদ সদস্য কঙ্গনা রনৌত (Kangana Ranaut)। আন্দোলনকারীদের ব্যবহৃত ভাষার সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি নিজেই একের পর এক আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। তার বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
যন্তর মন্তর ও অন্যান্য স্থানে আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত ভাষা এবং ইনস্টাগ্রাম পোস্টগুলোকে ‘বমি ভাব উদ্রেককারী’ বলে আখ্যা দেন কঙ্গনা। আন্দোলনের রিলগুলোর ভাষা ও দৃশ্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ‘আমার পুরো জীবনে এক জায়গায় এত কুৎসিত দৃশ্য আমি কখনও দেখিনি। জেন জি আন্দোলনের এই রিলগুলো দেখলে বমি আসে।’
আন্দোলনকারীদের কথা বলার ধরন ও তাদের ব্যবহৃত শব্দ নিয়েও তীব্র আপত্তি জানান এই অভিনেত্রী-রাজনীতিক। তিনি লেখেন, ‘তাদের কথা বলার ধরন এবং যে ধরনের ভাষা তারা ব্যবহার করছে… আমার জীবনে কখনও প্রতিটি ফ্রেমে সবকিছু একযোগে এত কর্কশ ও বিশ্রী দেখিনি।’
শুধু ভাষার সমালোচনাতেই থেমে থাকেননি কঙ্গনা। এরপর আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের লালন-পালন এবং তাদের অভিভাবকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, ‘ইশ! এদের কারা জন্ম দিচ্ছে আর কীভাবে মানুষ করছে?’
আন্দোলনকারীদের একটি অংশ নিজেদের ‘তেলাপোকা’ হিসেবে অভিহিত করেছিল। সেই প্রসঙ্গ টেনে কঙ্গনা আরও কঠোর ভাষায় তাদের আক্রমণ করেন। তিনি বলেন, ভারত বৈচিত্র্যময় ও সুন্দর মানুষের দেশ, যেখানে মানুষ মার্জিত এবং নান্দনিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত। একই সঙ্গে তাদের শিকড় সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত।
এরপর আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে কঙ্গনা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের তেলাপোকা বলো এবং দেখতে ও আচরণেও তাদের মতোই। এতে কোনও বৈপরীত্য নেই। তোমরা শুধু বিশ্বকে তোমাদের নোংরামি, আবর্জনা আর কুৎসিত রূপ দেখাচ্ছ।’
আন্দোলনের ভিডিওগুলো তাকে মানসিকভাবে আঘাত করেছে বলেও দাবি করেন তিনি। কঙ্গনা লেখেন, ‘এই রিলগুলো দেখে আমি মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছি। আমার এখন ডিজিটাল ডিটক্স ও মনের চিকিৎসা দরকার।’
তবে তার মন্তব্যের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশগুলোর একটি ছিল আন্দোলনে অংশ নেওয়া ‘হিন্দু নারীদের’ নিয়ে। তাদের ‘তথাকথিত পাশ্চাত্যমুখী ভারতীয় নারী’ বলে অভিহিত করে কঙ্গনা দাবি করেন, ওই নারীরা এতটাই দুর্নীতিগ্রস্ত ও কুৎসিত যে তারা গৃহিণী হওয়ারও যোগ্য নন।
আন্দোলনকারী নারীদের জীবনযাপন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিজেপির এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, ‘তারা গর্বের সঙ্গে নিজেদের মা’\দক গ্রহণ, ম’\দ খাওয়া এবং নির্লজ্জভাবে মা-বাবার উপার্জনে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা জাহির করে।’
এরপর শুধু আন্দোলনকারীদের নয়, পুরো তরুণ প্রজন্মকেই আক্রমণ করেন কঙ্গনা। তিনি তাদের ‘জেনারেশন গাটার’ বা ‘আবর্জনার প্রজন্ম’ বলে আখ্যা দেন। তার ভাষায়, ‘আমি এদের জেনারেশন গাটার বলি। সমাজ বা ব্যবস্থার জন্য এদের দেওয়ার মতো কিছুই নেই।’
কঙ্গনার দাবি, এই প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা পড়াশোনায়ও ভালো নয়। তিনি বলেন, ‘এরা পড়াশোনায় ভালো নয়। এরা এতটাই কুৎসিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত যে এরা গৃহিণীও হতে পারবে না।’
জেন জি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঙ্গনার এমন ক্ষোভ প্রকাশের পর রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। বিরোধী দলের নেতারা তার ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে কঙ্গনার নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
কংগ্রেস (Indian National Congress) নেতা ভাই জগতাপ (Bhai Jagtap) জানতে চান, আন্দোলনের সময় যেভাবে শিক্ষার্থীদের পেটানো হয়েছিল, তা নিয়ে কঙ্গনার মনে কোনো অনুশোচনা রয়েছে কি না।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মেয়েদের ও সন্তানদের এই আন্দোলনের সময় যেভাবে হয়রানি করা হয়েছে, পেটানো হয়েছে এবং নি’\র্যাতন করা হয়েছে, নিজে একজন নারী হয়েও কীভাবে তার মনে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা কাজ করে না? এটি সত্যিই আমার কাছে আশ্চর্যজনক মনে হয়।’
এদিকে ওয়ারিস পাঠান (Waris Pathan) কঙ্গনার ভাষার তীব্র নিন্দা জানান। এআইএমআইএমের এই নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উচিত তার দলের সংসদ সদস্য কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করছেন, সেদিকে নজর দেওয়া।
তিনি বলেন, ‘কঙ্গনা রনৌত যদি এমন শব্দ ব্যবহার করে থাকেন, তবে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। তাকে জিজ্ঞেস করুন তো তিনি নিট-এর পূর্ণরূপ জানেন কি না? তিনি তাও জানবেন না।’
ওয়ারিস পাঠান আরও দাবি করেন, কঙ্গনার উচিত পুরো জেনারেশন জি-র কাছে ক্ষমা চাওয়া। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও দেখা উচিত, তার দলের সংসদ সদস্যরা তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে কী ধরনের ভাষায় কথা বলছেন।
তার ভাষায়, ‘তার পুরো জেনারেশন জি-র কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রী মোদির উচিত তার দলের সাংসদরা জেন জি-র জন্য কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করছেন, তা খতিয়ে দেখা।’
আন্দোলন নিয়ে কঙ্গনার মন্তব্য করার ঘটনা অবশ্য এটিই প্রথম নয়। এর আগেও তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে আন্দোলনকারীদের ভূমিকা ও তাদের গৃহীত পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টারও কঠোর সমালোচনা করেছিলেন তিনি। তবে এবার আন্দোলনকারীদের ভাষা, জীবনযাপন, পারিবারিক শিক্ষা এবং পুরো প্রজন্মকে একসঙ্গে আক্রমণ করায় তার বক্তব্য নতুন মাত্রার বিতর্ক তৈরি করেছে।
বিশেষ করে নারী আন্দোলনকারীদের গৃহিণী হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং তরুণদের ‘জেনারেশন গাটার’ বলে অভিহিত করার পর তার মন্তব্যকে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অবমাননাকর ভাষা হিসেবে দেখছেন সমালোচকেরা। বিপরীতে কঙ্গনা দাবি করেছেন, আন্দোলনের পোস্ট ও রিলগুলোতে ব্যবহৃত ভাষা এবং উপস্থাপনাই তাকে এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করেছে।


