উমামা ফাতেমাকে নিয়ে তাসনিম জারার দীর্ঘ পোস্ট, বললেন—‘ওর মধ্যে নতুন কিছুর আশা এখনো বেঁচে আছে’

জুলাই অ’\ভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আ’\ন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ উমামা ফাতেমা (Umama Fatema)-কে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ একটি পোস্ট দিয়েছেন ডা. তাসনিম জারা (Dr. Tasnim Jara)। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে পোস্টটি প্রকাশ করেন এনসিপির সাবেক এই নেত্রী।

পোস্টের শুরুতেই তাসনিম জারা অ’\ভ্যুত্থানের পরপর দেখা একটি সাক্ষাৎকারের স্মৃতিচারণ করেন। ওই সাক্ষাৎকারে উমামা ফাতেমার সঙ্গে নুসরাত ও রাফিয়াও ছিলেন। তাঁরা আ’\ন্দোলনের দিনগুলোতে কী করেছিলেন, কেন করেছিলেন এবং কেমন দেশ দেখতে চান—এসব বিষয়ে কথা বলেছিলেন।

তাসনিম জারা লেখেন, ‘অ’\ভ্যুত্থানের পরপর উমামা ফাতেমা, নুসরাত আর রাফিয়ার একটা ইন্টারভিউ দেখেছিলাম। ওরা বলছিল—আ’\ন্দোলনের দিনগুলোতে কী করেছে, কেন করেছে, কেমন দেশ চায়। এত সাহসী, এত খোলামেলা, আর এত অল্প বয়সে এত পরিণত কথা আমি বেশি দেখিনি। আমার রাজনীতিতে আসার পেছনে যে কয়েকটা ধাক্কা কাজ করেছে, ওই ইন্টারভিউটা তার একটা।’

দেশে ফিরে উমামার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন তাসনিম জারা। তাঁর ভাষায়, প্রথম দেখার দিন তিনি রীতিমতো ‘স্টারস্ট্রাক’ হয়ে গিয়েছিলেন। তবে সামনাসামনি উমামাকে তাঁর আরও সহজ ও স্বাভাবিক মনে হয়েছে।

তিনি লেখেন, ‘উমামা সামনাসামনি আরও সহজ। কোনো পারফরম্যান্স নেই। যা বিশ্বাস করে তা-ই বলে, যা বলে তা-ই করে।’

নতুন করে রাজনীতিতে আসা মানুষের সামনে প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত, চাপ ও অনিশ্চয়তার প্রসঙ্গ টেনে তাসনিম জারা বলেন, এমন পরিস্থিতিতে নিজের নৈতিক দিকনির্দেশনা বা ‘কম্পাস’ ঠিক রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর শুরু থেকে ভেবে বের করা সব সময় সম্ভব হয় না। সে কারণেই এমন কিছু মানুষের প্রয়োজন হয়, প্রয়োজনে যাঁদের বিবেচনার ওপর আস্থা রাখা যায়।

তাঁর ভাষায়, উমামাকে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল—উমামা এমনই একজন মানুষ হতে পারেন। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়েছে, অনেককে বদলে যেতে দেখেছেন, অনেকের কাছ থেকে হতাশও হয়েছেন। কিন্তু উমামা তাঁর অবস্থানে রয়ে গেছেন।

তাসনিম জারা লেখেন, ‘আমাদের মতো নতুন রাজনীতিতে আসা মানুষদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটা হলো নিজের কম্পাস ঠিক রাখা। প্রতিদিন এত সিদ্ধান্ত, এত চাপ, এত ধোঁয়াশা; সব প্রশ্নের উত্তর গোড়া থেকে ভেবে বের করা সম্ভব না। তাই কয়েকজন মানুষ লাগে, প্রয়োজনে যাদের বিবেচনার ওপর ভরসা করা যায়। উমামাকে দেখে মনে হতো, ও আমার সেই মানুষদের একজন হতে পারে। তারপর অনেকটা সময় গেছে। অনেককে বদলে যেতে দেখেছি। অনেকের কাছ থেকে হতাশ হয়েছি। উমামা রয়ে গেছে।’

গত দুই বছরে উমামা ফাতেমার নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কথাও পোস্টে উল্লেখ করেন তাসনিম জারা। তিনি বলেন, যে প্ল্যাটফর্মকে উমামা আর নিজের বক্তব্য ও বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেননি, সেখান থেকে নিজেই বেরিয়ে এসেছেন। রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব পেয়েও ‘না’ বলেছেন।

ডাকসু (DUCSU) নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের ছায়া ছাড়াই স্বতন্ত্র প্যানেল নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। উমামা সেখানে হেরে গেলেও নিজের শর্তে নির্বাচন করেছেন বলে মন্তব্য করেন তাসনিম জারা।

তিনি লেখেন, ‘উমামার কাছে ক্ষমতার রাস্তাটা খোলা ছিল, চাইলেই সে যেতে পারত। সে যায়নি, কারণ সে হাতের নাগালের ক্ষমতাকে “না” বলেছে।’

এনসিপি (NCP)-র সাবেক এই নেত্রীর মতে, দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার দিকে এগিয়ে যাওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা। কিন্তু নিজের কথা ও আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে ক্ষমতা প্রত্যাখ্যান করা বিরল।

পোস্টে ‘পজিশন’ ও ‘পারপাস’ বা পদ এবং উদ্দেশ্যের মধ্যকার পার্থক্য নিয়েও কথা বলেন তাসনিম জারা। তিনি বলেন, ইদানীং অনেকে এই দুটিকে এক করে দেখেন। সেই হিসাব থেকেই উমামাকে ব্যর্থ বলা হয়, কারণ তিনি সংসদ সদস্য হতে পারেননি।

তাসনিম জারার ভাষায়, এমন দৃষ্টিভঙ্গিতে এমপি হওয়াটাই যেন সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড। একজন মানুষ মানুষের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনতে পারলেন কি না, সেই প্রশ্ন সেখানে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।

তিনি লেখেন, ‘এমপি হওয়াটাই যেন সফলতা; মানুষের জীবনে কিছু বদলাতে পারলেন কি না, সে প্রশ্নটা অপ্রাসঙ্গিক। এই হিসাব মানলে স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশের প্রতিটা এমপিই সফল। কারণ, তারা তো এমপি হয়েছিলেন।’

সাফল্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি দুটি প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন—কোনো ব্যক্তি একটি অবস্থান বা পদ কীভাবে পেলেন এবং সেই পদ পাওয়ার পর কী করলেন। যেকোনো মূল্যে আসন পাওয়ার চেষ্টা পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তেরই নিয়ম বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তাসনিম জারা বলেন, পুরোনো নিয়ম মেনে খেললে নতুন বন্দোবস্ত আর থাকে না; বদলায় কেবল মুখ। তাঁর মতে, উমামা সেই ধারার রাজনীতির অংশ নন। এ কারণেই উমামার মধ্যে নতুন কিছুর সম্ভাবনা এখনো টিকে আছে।

তিনি লেখেন, ‘আসল হিসাব হয় দুইটা প্রশ্নে: পজিশনটা পেলেন কীভাবে, আর পেয়ে করলেন কী। যেকোনো মূল্যে আসন চাই, এ তো পুরোনো বন্দোবস্তেরই নিয়ম। ওই নিয়মে খেললে নতুন বন্দোবস্ত থাকে কোথায়? বদলায় শুধু মুখ। উমামা ওই দলে নেই। সেজন্যই ওর মধ্যে নতুন কিছুর আশা এখনো বেঁচে আছে।’

উমামা ফাতেমার জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়া নিয়েও নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন তাসনিম জারা। তিনি বলেন, কেউ কেউ উমামাকে মঞ্চে কথা বলতে দেখলে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। কিন্তু উমামাকে কথা বলতে দেখলে তাঁর নিজের মেরুদণ্ড যেন আরও একটু সোজা হয়ে যায়।

পোস্টের শেষাংশে ছোটবেলায় শোনা ‘চীনের দুঃখ হোয়াংহো’ কথাটির প্রসঙ্গ টানেন তাসনিম জারা। তিনি বলেন, অনেকে উমামাকে হোয়াংহো নদী (Yellow River)-র সঙ্গে তুলনা করে ব্যর্থদের সারিতে ফেলতে চান।

তবে পরবর্তী সময়ে তিনি জেনেছেন, সেই হোয়াংহো নদীর পলিমাটিতেই চীনা সভ্যতার জন্ম হয়েছিল। যে নদীকে মানুষ দুঃখ বলে, সেই নদীই আবার নতুন কিছুর জন্ম দেয়—এই তুলনার মধ্য দিয়ে উমামাকে ঘিরে নিজের আশাবাদ তুলে ধরেন তিনি।

তাসনিম জারা লেখেন, ‘ছোটবেলায় শুনেছিলাম, চীনের দুঃখ হোয়াংহো। উমামাকে অনেকে হোয়াংহো নদীর সঙ্গে তুলনা করে ব্যর্থদের কাতারে ফেলতে চায়। কিন্তু বড় হয়ে জেনেছি, ওই হোয়াংহোর পলিমাটিতেই চীনা সভ্যতার জন্ম। যে নদীকে লোকে দুঃখ বলে, সে নদীই আসলে জন্ম দেয়।’

পোস্টের শেষে নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের আস্থার কথাও জানান তাসনিম জারা। তাঁর ভাষায়, নতুন বাংলাদেশের কথা ভাবলে যাঁদের চেহারা ভরসার প্রতীক হয়ে তাঁর মানসপটে ভেসে ওঠে, তাঁদের মধ্যে উমামা ফাতেমা একজন।