আমিরাতে বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল, কারণ খুঁজছে দূতাবাস

সংযুক্ত আরব আমিরাত (United Arab Emirates)-এ কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মভিসা কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছে। হঠাৎ ভিসা অকার্যকর হয়ে যাওয়ায় দেশে ছুটিতে থাকা এবং আমিরাতে অবস্থানরত—দুই পক্ষের কর্মীরাই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে ভিসা বাতিলের প্রকৃত কারণ শনাক্ত করতে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে আবুধাবিতে বাংলাদেশ দূতাবাস (Bangladesh Embassy in Abu Dhabi)।

একই সঙ্গে দূতাবাস প্রবাসী বাংলাদেশিদের সতর্ক করে বলেছে, ভিসা সমস্যার সমাধান করে দেওয়ার আশ্বাসে কোনো দালাল, ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে আর্থিক লেনদেন করা যাবে না। সরকারি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে অর্থ দিলে প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মিশনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (২৮ জুলাই) দূতাবাসের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার ঘটনাগুলো কোনো কারিগরি ত্রুটির কারণে ঘটছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো বিশেষ কারণ রয়েছে—তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দূতাবাসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, আমিরাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা বাতিল হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের সমস্যা সমাধানে দূতাবাস সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৩০০ প্রবাসীর আবেদনের তথ্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এসব আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য-উপাত্তও যুক্ত করা হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, দূতাবাসের কাছে জমা পড়া আরও প্রায় ১ হাজার ৪০০টি আবেদন বর্তমানে যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। আবেদনকারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্র সংগ্রহ করে সেগুলোও পর্যায়ক্রমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। প্রতিটি আবেদন সঠিকভাবে যাচাই না করে পাঠালে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলেই এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।

দেশে আটকে পড়ছেন কর্মীরা

ভিসা বাতিলের ঘটনায় দেশে অবস্থানরত হাজারো প্রবাসী কর্মী চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। অনেকেই ছুটি কাটিয়ে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার পর বিমানবন্দরে গিয়ে জানতে পারছেন, তাদের ভিসা আর কার্যকর নেই। ফলে টিকিট, ছুটির সময়সীমা এবং চাকরিতে যোগদানের পরিকল্পনা—সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

আবার কিছু কর্মী সংযুক্ত আরব আমিরাতে পৌঁছে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় জানতে পারছেন, তাদের কর্মভিসা ইতিমধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। পূর্বে কোনো নোটিশ বা আনুষ্ঠানিক বার্তা না পাওয়ায় তারা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন না। এতে কর্মীদের পাশাপাশি তাদের পরিবারও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, অনেকের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও ভিসা বাতিল হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দাবি, তাদের চাকরি বহাল রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ায় কোনো ঘাটতি ছিল না। তারপরও ভিসা কেন অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে, তার স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা তারা পাচ্ছেন না।

এ অবস্থায় ভিসা বাতিল হওয়ার আগেই কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন দেশে অবস্থানরত অনেক প্রবাসী। কেউ কেউ নির্ধারিত ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আমিরাতে ফিরতে টিকিট সংগ্রহ করছেন। হঠাৎ বাড়তি চাহিদা তৈরি হওয়ায় একমুখী বা ওয়ানওয়ে বিমান টিকিটের দামও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় যে একমুখী টিকিট পাওয়া যেত, এখন সেই টিকিট ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ভিসার অনিশ্চয়তার সঙ্গে অস্বাভাবিক বিমানভাড়া যোগ হওয়ায় প্রবাসী কর্মীদের আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে। অনেকেই উচ্চমূল্যে টিকিট কিনেও শেষ পর্যন্ত আমিরাতে প্রবেশ করতে পারবেন কি না, সে নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।

‘শুধু বাংলাদেশের কর্মীদের সমস্যা নয়’

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (Ministry of Expatriates’ Welfare and Overseas Employment)-এর মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী (Ariful Haque Choudhury) বলেছেন, কর্মভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার ঘটনাটি শুধু বাংলাদেশের কর্মীদের ক্ষেত্রেই ঘটছে না। পাকিস্তান, নেপালসহ আরও কয়েকটি দেশের কর্মীদের ভিসাও একইভাবে বাতিল হচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা বাতিলের কারণ, ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের বর্তমান অবস্থা এবং সম্ভাব্য সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। প্রয়োজন হলে কূটনৈতিক পর্যায়েও বাংলাদেশি কর্মীদের সমস্যাটি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হবে। কারণ হঠাৎ ভিসা বাতিল হয়ে যাওয়ায় অনেক কর্মীর চাকরি, আয় এবং পরিবারের জীবিকা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

প্রায় পাঁচ হাজার ভিসা বাতিলের তথ্য

জানা গেছে, গত ২২ জুলাই থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার ঘটনাগুলো সামনে আসতে শুরু করে। এরপর প্রতিদিনই নতুন নতুন কর্মী একই ধরনের সমস্যার কথা জানাচ্ছেন। কেউ বিমানবন্দরে, কেউ অনলাইনে ভিসার অবস্থা যাচাই করতে গিয়ে, আবার কেউ আমিরাতে পৌঁছানোর পর বিষয়টি জানতে পারছেন।

বিভিন্ন সূত্রে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর ভিসা বাতিল হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এই সংখ্যা সরকারিভাবে নিশ্চিত নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার (Government of the United Arab Emirates) এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ করেনি।

ফলে প্রকৃতপক্ষে কতজন বাংলাদেশি কর্মীর ভিসা বাতিল হয়েছে, কোন ধরনের ভিসা বেশি affected হয়েছে এবং এর পেছনে একক কোনো কারণ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। দূতাবাস সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এই তথ্যগুলো নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।

দালালের ফাঁদে না পড়ার সতর্কতা

পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধু ব্যক্তি বা চক্র যাতে প্রবাসীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতে না পারে, সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ দূতাবাস। ভিসা পুনর্বহাল বা সমস্যার দ্রুত সমাধান করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কেউ অর্থ দাবি করলে তার সঙ্গে কোনো ধরনের লেনদেন না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

দূতাবাস জানিয়েছে, ভিসাসংক্রান্ত যেকোনো জটিলতায় প্রবাসীদের সরকারি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ সরাসরি বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যক্তি, দালাল বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কথায় অর্থ দিয়ে ভিসা সমস্যার সমাধান সম্ভব—এমন আশ্বাসে বিশ্বাস না করতেও বলা হয়েছে।