‘টক্সিক’ ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে, ছবির পাশে দাঁড়িয়ে কিয়ারা বললেন—শেষ পর্যন্ত গল্পই মনে থাকে

মুক্তির আগেই তুমুল বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে কন্নড় সুপারস্টার যশ (Yash) অভিনীত বহুল প্রতীক্ষিত ছবি ‘টক্সিক: আ ফেয়ারি টেল ফর গ্রোন-আপস’ (Toxic: A Fairy Tale for Grown-Ups)। পর্দায় নারীদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন, ছবির প্রচারণায় নারী চরিত্রগুলোর অনুপস্থিতি এবং সাম্প্রতিক ‘তাবাহি’ গানকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তীব্র সমালোচনা। এমন পরিস্থিতিতে ছবিটির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন অভিনেত্রী কিয়ারা আদভানি (Kiara Advani)। তার বিশ্বাস, চলমান সব বিতর্ক ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত দর্শক সিনেমার সততা এবং শক্তিশালী গল্পের সঙ্গেই সংযোগ তৈরি করবেন।

সম্প্রতি ফেমিনাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কিয়ারা জানান, ‘টক্সিক’-এর নাদিয়া চরিত্রে অভিনয় করা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। পরিচালক গীতু মোহনদাস (Geetu Mohandas) যখন প্রথম তার কাছে চরিত্রটির বিস্তারিত তুলে ধরেন, তখনই তিনি মুগ্ধ হয়ে যান।

কিয়ারার ভাষায়, ‘গল্পটি শোনার পরই বুঝেছিলাম, চরিত্রটি অসাধারণভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। শক্তি, ভঙ্গুরতা, উন্মাদনা, বিচ্ছিন্নতা ও সংবেদনশীলতা—একজন অভিনেত্রী হিসেবে আমি যেসব আবেগ ও বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করতে চাই, তার সবই এই চরিত্রের মধ্যে আছে। একজন অভিনেতা আসলে এমন চরিত্রের অপেক্ষাতেই থাকেন।’

কিয়ারা জানান, অভিনয়জীবনের এমন এক পর্যায়ে এসে তিনি এ ধরনের কঠিন ও বহুমাত্রিক চরিত্রে অভিনয় করার আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছেন। একই সঙ্গে নাদিয়া চরিত্রের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন তিনি। তার মতে, অভিনয়ের আসল কাজ ক্যামেরার সামনে শুরু হয় না; বরং শুটিং শুরু হওয়ার অনেক আগেই একজন অভিনেতার ভেতরে সেই প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

কিয়ারা বলেন, ‘চরিত্রটির আবেগ, সম্পর্ক, ভয় এবং প্রেরণা নিয়ে আমি দীর্ঘ সময় ধরে ভাবি। এরপর আসে তার শরীরী ভাষা, কণ্ঠের ধরন, পোশাক, হাঁটাচলা ও চলাফেরার বিষয়গুলো। দর্শক পর্দায় শুধু চূড়ান্ত অভিনয়টি দেখেন, কিন্তু এর পেছনে প্রস্তুতির যে দীর্ঘ পথ, সেটি তাদের চোখে পড়ে না।’

তার ভাষ্য, নাদিয়া চরিত্রটিকে নিজের ভেতরে তৈরি করতে গিয়ে তিনি যেন নতুন করে অভিনয়ের প্রেমে পড়েছেন। কিয়ারা বলেন, ‘প্রতিটি চরিত্রের মধ্যে আমার নিজের কিছুটা অংশ থেকে যায়। আবার প্রতিটি চরিত্রের কাছ থেকেও আমি নিজের জীবনের জন্য কিছু না কিছু সঙ্গে নিয়ে আসি।’

তবে কিয়ারার এই ইতিবাচক অভিজ্ঞতার বিপরীতে কয়েক মাস ধরে ‘টক্সিক’ ঘিরে বিতর্ক থামার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং ছবিটির প্রচারণার প্রতিটি ধাপেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে নারী চরিত্রের উপস্থাপন ও গুরুত্ব নিয়ে।

২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত ছবিটির প্রথম টিজারে কবরস্থানে ধারণ করা কয়েকটি ইঙ্গিতপূর্ণ দৃশ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার সূত্রপাত হয়। পরে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কর্ণাটক রাজ্য মহিলা কমিশন (Karnataka State Commission for Women) বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র প্রত্যয়ন বোর্ড (Central Board of Film Certification)-এর কাছে চিঠি পাঠায়।

কমিশনের অভিযোগে বলা হয়, ছবিটির কিছু দৃশ্য নারী ও শিশুদের সামাজিক কল্যাণের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। ওই চিঠির পর ছবিটির বিষয়বস্তু এবং নির্মাতাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

এরপর ১ জুলাই নির্মাতারা ‘লেডিজ অ্যান্ড লেডিজ’ শিরোনামে দ্বিতীয় টিজার প্রকাশ করেন। নির্মাতাদের উদ্দেশ্য ছিল, ছবিটির গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্রগুলোর সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। কিন্তু সেই টিজারও বিতর্ক প্রশমিত করার বদলে নতুন করে সমালোচনার জন্ম দেয়।

সমালোচকদের অভিযোগ, নারী চরিত্রগুলোকে সামনে আনার কথা বলা হলেও ছবিটির প্রচারণায় এখনো যশকেই মূল কেন্দ্র হিসেবে রাখা হয়েছে। তাদের মতে, নারী চরিত্রগুলোর গুরুত্ব যথেষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি এবং প্রচারণার সামগ্রিক কাঠামোও পুরুষকেন্দ্রিক রয়ে গেছে।

কিয়ারা অবশ্য এমন মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নন। তার দাবি, ‘টক্সিক’-এর প্রতিটি নারী চরিত্রই আলাদা বৈশিষ্ট্য, শক্তি ও স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে নির্মিত হয়েছে। গল্পে তাদের উপস্থিতি কেবল পার্শ্বচরিত্র হিসেবে নয়, বরং নিজস্ব অবস্থান নিয়েই তৈরি করা হয়েছে।

কিয়ারা বলেন, ‘নয়নতারা, হুমা কুরেশি, তারা সুতারিয়া ও রুক্মিণী বসন্তের সঙ্গে কাজ করা দারুণ এক অভিজ্ঞতা ছিল। প্রত্যেকেই নিজস্ব শক্তি ও স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে পর্দায় হাজির হয়েছেন। একই ছবির মধ্যে এত ভিন্ন ধরনের নারী চরিত্র দর্শকদের ভালো লাগবে বলেই আমার বিশ্বাস।’

শুটিংয়ের পরিবেশ নিয়েও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন কিয়ারা। তার ভাষায়, ‘সেটে অনেক দিনই এমন মনে হয়েছে, আমরা সবাই মিলে সত্যিই নতুন কিছু তৈরি করার চেষ্টা করছি। এ ধরনের মুহূর্তগুলোই বারবার মনে করিয়ে দেয়, কেন আমি সিনেমাকে এত ভালোবাসি।’

হিন্দি ও তেলেগু চলচ্চিত্রে কাজ করার পর এবার কন্নড় সিনেমায় অভিনয়ের অভিজ্ঞতা নিয়েও কথা বলেছেন কিয়ারা। তার মতে, বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ তাকে নতুনভাবে ভাবতে এবং অভিনয়কে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শিখিয়েছে।

কিয়ারা বলেন, ‘তারকাখ্যাতি হয়তো দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে নিয়ে আসতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের মনে থেকে যায় গল্প। মানুষ আসলে সততার সঙ্গেই সংযোগ তৈরি করেন।’

গীতু মোহনদাস পরিচালিত ‘টক্সিক’ ছবিতে যশকে দ্বৈত চরিত্রে দেখা যাবে। তার সঙ্গে অভিনয় করেছেন কিয়ারা আদভানি, নয়নতারা, হুমা কুরেশি, তারা সুতারিয়া ও রুক্মিণী বসন্ত।

কেভিএন প্রোডাকশনস ও মনস্টার মাইন্ড ক্রিয়েশনসের প্রযোজনায় নির্মিত ছবিটি কন্নড় এবং ইংরেজি ভাষায় ধারণ করা হয়েছে। পরে এটি হিন্দি, তামিল, তেলেগু ও মালয়ালম ভাষাতেও মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে।