প্যারিসের ‘ফ্রাঙ্কো-বাংলা সামার ফেস্ট’: বিএমডব্লিউ লটারি ঘিরে তুমুল বিতর্ক

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস (Paris)-এর শহরতলি সার্সেলে গত ২ আগস্ট শাহ গ্রুপ ও অফিওরা-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘ফ্রাঙ্কো-বাংলা সামার ফেস্ট’ শেষ হলেও আয়োজনটি ঘিরে আলোচনা থামছে না। বরং অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ একটি বিএমডব্লিউ গাড়ির লটারির ফলাফলকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন, পাল্টা বক্তব্য ও বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী নগর বাউল জেমস (Nagar Baul James), রাহুল আনন্দ (Rahul Anand) এবং আরও কয়েকজন শিল্পীর অংশগ্রহণে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে কয়েক হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও দর্শকসমাগমের কারণে অনুষ্ঠানটি শুরুতে উৎসবমুখর আবহ তৈরি করলেও, আয়োজন শেষ হওয়ার পর লটারিতে বিজয়ী নির্বাচন নিয়ে ওঠা বিতর্ক এখন প্যারিসের বাংলাদেশি কমিউনিটির গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল আলোচনায় পরিণত হয়েছে।

অনুষ্ঠানের অন্যতম বড় আকর্ষণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল একটি বিএমডব্লিউ গাড়ির লটারি। আয়োজকদের প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, লটারিতে বিজয়ী হন রেজওয়ানা চৌধুরী মিম (Rezwana Chowdhury Mim) নামে এক প্রবাসী বাংলাদেশি নারী।

বিজয়ী হওয়ার পর প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, এমন একটি মূল্যবান পুরস্কার জিততে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত এবং সম্মানিত বোধ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ঘিরে চলমান সমালোচনা ও বিভিন্ন মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব বক্তব্যকে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

তবে লটারির ফলাফল ঘোষণার পরপরই ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা। অনেক ব্যবহারকারী অভিযোগ করেন, লটারির ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল এবং বিজয়ীকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। কেউ কেউ অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক কৌশিক রাব্বানী (Kaushik Rabbani)-কে ঘিরেও নানা অভিযোগ তুলে পোস্ট করেন।

আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাংশ দাবি করেন, বিজয়ী গাড়ি চালাতে না জানায় শেষ পর্যন্ত গাড়িটি আয়োজকদের কাছেই থেকে যেতে পারে কিংবা সেটি সংশ্লিষ্ট শোরুমে ফিরিয়ে দেওয়া হতে পারে। তবে এ ধরনের অভিযোগ ও দাবির পক্ষে কোনো স্বাধীন, নির্ভরযোগ্য কিংবা যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।

বিতর্কের একপর্যায়ে বিজয়ী রেজওয়ানা চৌধুরী মিমকে লক্ষ্য করেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন আপত্তিকর, মানহানিকর ও ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। বহু ফেসবুক ব্যবহারকারী তাকে নিয়ে নানা ধরনের কটাক্ষ করেন। তার ছবি ব্যবহার করেও বিভ্রান্তিকর এবং আপত্তিকর কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে বলে দেখা গেছে।

তবে তাকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া এসব দাবি বা প্রচারণার সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণও সামনে আসেনি।

সমালোচনার মুখে আয়োজকদের অন্যতম কৌশিক রাব্বানী নিজের ফেসবুক পোস্টে লটারি পরিচালনার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করেন। তিনি লেখেন, “কিভাবে লটারি করা হলো? সব টিকিট দিয়েই শুরু। টিকিট বিক্রি ৪ হাজার ক্রস করেনি, তাই প্রথম সংখ্যার জন্য ১ থেকে ৩ পর্যন্ত নম্বর রাখা হয়। এরপর বাকি তিনটি সংখ্যা একের পর এক একাধিক শিশুর মাধ্যমে চোখ বন্ধ অবস্থায় তোলা হয়। সংখ্যাগুলো আগে থেকেই প্রিন্ট করা ছিল, শুধু একটি বোর্ডে আঠা দিয়ে লাগানো হয়েছিল। না বুঝলে, কফির দাওয়াত।”

একই পোস্টে তিনি আরও লেখেন, “যিনি গাড়িটি জিতেছেন, লাইসেন্স না থাকার কারণে তিনি গাড়িটি বিক্রি করতে চাচ্ছেন। আগ্রহী থাকলে কমেন্টে আপনার নাম লিখে দিলে, ওই ব্যক্তি যোগাযোগ করবে।”

লটারির ব্যাখ্যার পাশাপাশি গাড়ি বিক্রির আগ্রহের কথা প্রকাশ করার পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সমালোচকদের একাংশ প্রশ্ন তোলেন, লটারির ফলাফল ঘোষণার পরপরই গাড়ি বিক্রির বিষয়টি প্রকাশ্যে জানানোর প্রয়োজন কেন দেখা দিল। তাদের কেউ কেউ এটিকে লটারির ফলাফল নিয়ে আগে থেকে চলা সন্দেহের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন।

অন্যদিকে আয়োজকদের সমর্থনে কথা বলা ব্যক্তিরা বলছেন, পুরস্কার হিসেবে গাড়িটি পাওয়ার পর সেটি রাখা হবে, ব্যবহার করা হবে নাকি বিক্রি করা হবে—এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সম্পূর্ণভাবে বিজয়ীর। তাদের যুক্তি, গাড়ি বিক্রি করার ইচ্ছার সঙ্গে লটারি পরিচালনার স্বচ্ছতা বা ফলাফল নির্ধারণের প্রক্রিয়ার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।

এদিকে অনুষ্ঠানের আরেক আয়োজক সাত্তার আলী সুমন (Sattar Ali Sumon) এবং কৌশিক রাব্বানী দাবি করেছেন, পুরো লটারি স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ছে, সেগুলোর অধিকাংশই ভিত্তিহীন এবং কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই প্রচার করা হচ্ছে।

প্যারিসের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে বিষয়টি নিয়ে এখনও ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিতর্কে অংশ নেওয়া একপক্ষ লটারির সম্পূর্ণ ভিডিও প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা টিকিট নম্বর নির্বাচন, প্রতিটি সংখ্যা তোলার দৃশ্য এবং চূড়ান্তভাবে বিজয়ী নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়াটি জনসমক্ষে তুলে ধরার আহ্বান জানাচ্ছেন।

তাদের মতে, লটারির প্রতিটি ধাপের ভিডিও ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করা হলে জনমনে তৈরি হওয়া সন্দেহ ও বিভ্রান্তির একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে।

অন্যদিকে কমিউনিটির অনেকেই কোনো প্রমাণ ছাড়াই একজন নারীকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করা, তার বিরুদ্ধে আপত্তিকর প্রচারণা চালানো এবং তার ব্যক্তিগত পরিচয় ও জীবন নিয়ে কটাক্ষ করার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তারা বলছেন, লটারির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সেটি অবশ্যই তথ্য, প্রমাণ ও যৌক্তিক বক্তব্যের ভিত্তিতে আলোচনা করা উচিত। কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে অপমানজনক মন্তব্য কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ সমস্যার সমাধান নয়।

তাদের আরও বক্তব্য, লটারি পরিচালনার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং আয়োজকদের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া নাগরিক ও অংশগ্রহণকারীদের অধিকার। কিন্তু সেই প্রশ্নের আড়ালে বিজয়ী ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে হেয় করা বা যাচাইহীন অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত লটারি পরিচালনার প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো সরকারি তদন্ত শুরু হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানিয়েছে—এমন তথ্যও প্রকাশ্যে আসেনি।

ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে আয়োজকদের দাবির বাইরেও লটারির পুরো প্রক্রিয়া যাচাইয়ের মতো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা নিরপেক্ষ নথি এখন পর্যন্ত সামনে আসেনি।

তবে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এ বিতর্ক ইতোমধ্যে ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। লটারির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, আয়োজকদের ব্যাখ্যা, বিজয়ীর গাড়ি বিক্রির আগ্রহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ—সব মিলিয়ে ‘ফ্রাঙ্কো-বাংলা সামার ফেস্ট’-এর উৎসবের আলোচনা এখন অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে।