চিঠির স্বপ্নপূরণ অনুশ্রীর, রাকিবের জনদাবিও শুনলেন প্রধানমন্ত্রী; ঢাকার নদী রক্ষায় দ্রুত কর্মপরিকল্পনার নির্দেশ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের এক স্বপ্ন পূরণ হয়েছে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী অনুশ্রী রায় (Anushree Roy)-এর। অনুশ্রী রংপুরের গঙ্গাচড়া (Gangachara) উপজেলার পূর্ব নবনিদাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ প্রতিযোগিতায় দেশের গানে প্রথম এবং নজরুল সংগীতে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে অনুশ্রী। সেই সাফল্যের পর এবার তার জীবনে যোগ হলো আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত। গতকাল বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সে। সাক্ষাতের সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে একটি হারমোনিয়াম উপহার দেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব সুজাউদ্দৌলা সুজন মাহমুদ এ তথ্য জানিয়েছেন।

সুজন মাহমুদ জানান, গত ১৫ জুলাই বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে পদক গ্রহণ করতে গিয়েছিল অনুশ্রী। সেদিনই প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে নিজের মনের কথা লিখে একটি চিঠি তার এক কর্মকর্তার হাতে তুলে দেয় এই খুদে শিক্ষার্থী।

চিঠিতে সংগীতের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়েছিল অনুশ্রী। পাশাপাশি নিয়মিত সংগীতচর্চা চালিয়ে যেতে একটি হারমোনিয়ামের প্রয়োজনের কথাও লিখেছিল সে। শুধু তাই নয়, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একবার সরাসরি দেখা করার ইচ্ছার কথাও ছিল সেই চিঠিতে। পরে চিঠিটি প্রধানমন্ত্রীর হাতে পৌঁছায়। তিনি তা পড়ে অনুশ্রী ও তার পরিবারকে সাক্ষাতের জন্য আমন্ত্রণ জানান।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আনন্দ ধরে রাখতে পারছিল না খুদে সংগীতশিল্পী অনুশ্রী। নিজের বিস্ময় প্রকাশ করে সে জানায়, ‘কখনো বিশ্বাসই করতে পারিনি যে, আমার চিঠি প্রধানমন্ত্রী পড়বেন এবং সাক্ষাতের জন্য ডাকবেন।’

অনুশ্রী জানায়, তার সংগীতচর্চার জন্য একটি হারমোনিয়ামের খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের কারণে সেটি কেনা সম্ভব হচ্ছিল না। সেই কারণেই বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের অনুষ্ঠানের দিন নিজের প্রয়োজন ও ইচ্ছার কথা চিঠিতে লিখে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে।

অনুশ্রীর ভাষায়, ‘আমার সংগীতচর্চার জন্য একটি হারমোনিয়াম খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমার পরিবারের পক্ষে সেটি কেনার সামর্থ্য ছিল না। তাই চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের অনুষ্ঠানের দিন সেসব লিখে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দিয়েছিলাম। তবে সেই চিঠি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হাতেও দিতে পারিনি; তার একজন কর্মকর্তার হাতে দিয়েছিলাম। ভাবিনি, প্রধানমন্ত্রী আমার চিঠি পাবেন এবং পড়বেন।’

চিঠিটি সত্যিই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছেছে—এ খবরটিই প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিল না অনুশ্রী। পরে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ফোন আসার পর তার বিস্ময় আরও বেড়ে যায়। সে জানায়, ‘যখন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে একজন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন) আমাদের ফোন করে জানালেন যে প্রধানমন্ত্রী আমার লেখা সেই চিঠি পড়েছেন এবং আমাদের সাক্ষাতের জন্য ডেকেছেন, তখন যেন কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এরপর আজ আমাদের অবাক করে দিয়ে আমাদের সঙ্গে দেখা করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।’

সাক্ষাতের সময় অনুশ্রীর সঙ্গে স্নেহভরে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তার সংগীতচর্চা কেমন চলছে, সে বিষয়ে খোঁজখবর নেন তিনি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতেও নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

অনুশ্রীর সংগীত সাধনায় উৎসাহ দিতে তার চিঠিতে চাওয়া সেই হারমোনিয়ামও উপহার হিসেবে তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। যে বাদ্যযন্ত্রের অভাবের কথা লিখে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাহায্য চেয়েছিল পঞ্চম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী, শেষ পর্যন্ত সেটিই তার হাতে পৌঁছাল প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। সাক্ষাতের সময় প্রধানমন্ত্রীকে একটি দেশাত্মবোধক গানও শোনায় অনুশ্রী।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব সুজাউদ্দৌলা সুজন মাহমুদ জানান, মেয়েকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনুশ্রীর বাবা। তিনি জানান, তার মেয়েকে প্রধানমন্ত্রী নিজে ডেকে নিয়ে উৎসাহ দেবেন—এমন ঘটনা তারা কখনো কল্পনাও করেননি।

একই দিনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান তাবিউল ইসলাম রাকিব নামে এক নিরাপত্তাকর্মীও। রাকিব রাজধানীর কুড়িল-বিশ্বরোড এলাকায় একটি বেসরকারি ভবনে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কাজ করেন।

রাকিব জানান, ছোটবেলা থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার পরিবারের প্রতি তার বিশেষ অনুরাগ রয়েছে। তখন থেকেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একবার দেখা করার প্রবল ইচ্ছা ছিল তার। সেই আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিওও প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

ভিডিওতে রাকিব বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত তিনি ঢাকা ছাড়বেন না। শেষ পর্যন্ত তার সেই দীর্ঘদিনের ইচ্ছাও পূরণ হয়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তবে শুধু ব্যক্তিগত স্বপ্নপূরণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি রাকিব। সাক্ষাতের সুযোগে নিজের এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের একটি জনদাবিও প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন তিনি।

রাকিব জানান, বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে পানগুছি নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন। নদী পারাপারের সময় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। সেখানে একটি সেতু নির্মাণ করা হলে হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হবে বলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন।

রাকিব গত সাত মাস ধরে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কর্মরত। তার গ্রামের বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার নুরুল্লাহপুর শিকদারবাড়ি এলাকায়।

ঢাকার চারপাশের নদী দূষণ রোধে কর্মপরিকল্পনার নির্দেশ

এদিকে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দূষণ রোধে দ্রুত একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

গতকাল সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে ‘বুড়িগঙ্গা নদীর পানি ও পরিবেশ উন্নয়ন’ শীর্ষক এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশনা দেন বলে জানিয়েছেন তার উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন।

বৈঠকে বুড়িগঙ্গা নদী (Buriganga River), তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা এবং রাজধানীসংলগ্ন অন্যান্য নদীর বর্তমান পরিবেশগত অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। নদীগুলোতে দূষণের উৎস কোথায়, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো কী এবং দীর্ঘমেয়াদে এসব সমস্যার সমাধানে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন—এসব বিষয় বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।

বিশেষ করে শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে নিঃসরণ, অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খালগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান দুর্বলতাকে নদী দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

নদীগুলোকে দূষণের কবল থেকে রক্ষায় শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি কার্যকরভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, দূষণকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, বিদ্যমান পরিবেশ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।

শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, নদী রক্ষায় সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও অংশগ্রহণের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। নদী দূষণ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।

বৈঠকে পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা ওয়াসা (Dhaka WASA), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (Bangladesh Inland Water Transport Authority), রাজউক, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন, নদী রক্ষার এ কার্যক্রম শুধু সরকারি দপ্তর ও সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। পরিবেশবাদী সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণকেও এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোর দূষণ রোধে একটি সমন্বিত ও সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সেটির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে একটি আন্তঃসংস্থা সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে।

প্রস্তাবিত এই কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় করবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময় অন্তর গৃহীত পদক্ষেপের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করবে।

নদীগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নদী দূষণ এখন দুর্বিষহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে।