ঘন ঘন বিদ্যুতের লোডশেডিং এবং মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় মাগুরা (Magura)-য় তালের হাতপাখার চাহিদা কয়েক গুণ বেড়েছে। গরমের সঙ্গে বিদ্যুতের ভোগান্তি বাড়ায় জেলার বিভিন্ন গ্রামে গড়ে ওঠা পাখাপল্লীগুলোতে এখন কর্মব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কারিগররা। তালের হাতপাখা তৈরি করে অনেক পরিবার স্বাবলম্বী হয়েছে। বর্তমান ব্যস্ত মৌসুমে শিল্পীদের যেন এক মুহূর্তও অবসর নেই।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিবরামপুর (Shibrampur), নিজনান্দুয়ালী, সংকোচখালী, শক্রুজিৎপুর, আড়পাড়া (Arpara), বিনোদপুর, পারিয়াট ও ধনেশ্বরগাতীসহ মাগুরার বিভিন্ন গ্রামে তালের হাতপাখা তৈরি হয়। এসব গ্রামের দুই শতাধিক পরিবার প্রত্যক্ষভাবে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত।
মাগুরায় তৈরি এসব হাতপাখা শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে এখানকার পাখা। এতে একদিকে যেমন মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে তালের হাতপাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোকাম হিসেবেও পরিচিত হয়ে উঠেছে মাগুরা।
স্থানীয় বাজারে কয়েকজন নারী ও পুরুষকে পাখা কিনতে দেখা যায়। তারা জানান, কয়েক দিন ধরে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে দীর্ঘ সময় আর আসে না। ফলে উপায় না দেখে হাতপাখা কিনতে বাজারে এসেছেন তারা।
কারিগরদের ভাষ্য, একটি তালের হাতপাখা তৈরির কাজ শুরু হয় তালপাতা সংগ্রহের মধ্য দিয়ে। প্রথমে পাতা কেটে রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া হয়। এরপর সুতা ও বাঁশের শলাকা ব্যবহার করে সেলাই করে তৈরি করা হয় পাখার কাঠামো। সবশেষে পাখার সৌন্দর্য বাড়াতে বিভিন্ন রং ব্যবহার করা হয়।
ফাল্গুন থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত তালের হাতপাখা তৈরির প্রধান মৌসুম। এ সময় একজন শিল্পী প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০টি পাখা তৈরি করতে পারেন। একটি পাখা তৈরি করতে খরচ পড়ে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ টাকা। আর খুচরা বাজারে মানভেদে প্রতিটি হাতপাখা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা মাগুরায় এসে এসব তালের হাতপাখা কিনে নিয়ে যান। গরম যত বাড়ছে, হাতপাখার চাহিদাও তত বাড়ছে। ফলে কারিগর ও শিল্পীদের বসে থাকার মতো অবসর এখন নেই বললেই চলে।
এই শিল্পে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন গ্রামের নারীরাও। সংসারের দৈনন্দিন কাজ সামলে অবসর সময়ে তারা হাতপাখা তৈরি করেন। এই কাজ থেকে একজন নারী দৈনিক প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারছেন। পরিবারের পুরুষ সদস্যরাও পাখা তৈরির বিভিন্ন ধাপে সহযোগিতা করছেন। ফলে অনেক পরিবারের জন্য হাতপাখা তৈরি বাড়তি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে।
পাখাশিল্পী খাতুন ও আব্দুর রহিমসহ কয়েকজন কারিগর জানান, বর্তমানে তালপাতার সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন চালু রাখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে তালপাতা সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাদের। পাতা সংগ্রহের পর তা কেটে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হয়। এরপর বাঁশের শলাকা, সুতা ও রং ব্যবহার করে ধাপে ধাপে তৈরি করা হয় হাতপাখা।
তাদের ভাষ্য, বাজারে তালের হাতপাখার চাহিদা বাড়লেও কাঁচামালের দামও আগের তুলনায় বেড়েছে। বিশেষ করে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহে বেশি খরচ হওয়ায় প্রতিটি পাখার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। তারপরও বাড়তি চাহিদার কারণে মাগুরার পাখাপল্লীগুলোতে পুরোদমে চলছে উৎপাদন।


