২৫ বছরের সাধনায় ১৭ খণ্ডে ‘জামে তিরমিজি’র পূর্ণাঙ্গ আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ

হাদিস শরিফের সংরক্ষণ মুসলিম উম্মাহর অন্যতম অনন্য বৈশিষ্ট্য। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকেই লিখিতভাবে হাদিস সংরক্ষণের চর্চা থাকলেও হিজরি তৃতীয় শতাব্দীতে তা ব্যাপকভাবে গ্রন্থাকারে সংকলনের রূপ নেয়। এই শতাব্দীতেই কুতুবে সিত্তাহ বা সিহাহ সিত্তাহ নামে প্রসিদ্ধ হাদিসের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ কিতাব সংকলিত হয়। সেই ছয় গ্রন্থের মধ্যে ‘জামে তিরমিজি’ বিশেষ মর্যাদায় সমাসীন। ইমাম আবু ঈসা মুহাম্মাদ বিন ঈসা বিন সাওরা তিরমিজি (রহ.) [২০৯-২৭৯ হি.] সংকলিত এই গ্রন্থটি রচনাকাল থেকেই আলেমসমাজে ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও পঠিত হয়ে আসছে।

‘জামে তিরমিজি’র একাধিক ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত হলেও সময়ের সঙ্গে গুণগত মানে আরও সমৃদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গ একটি শরহের প্রয়োজনীয়তা সুধীমহলে অনুভূত হচ্ছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেই প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে এসেছেন বাংলাদেশি আলেম ও বিদগ্ধ মুহাদ্দিস মাওলানা আবদুল মতীন [জন্ম ১৯৬৪ খ্রি.]। দীর্ঘ ২৫ বছরের সাধনা ও গবেষণার পর তিনি আরবি ভাষায় ১৭ খণ্ডে ‘জামে তিরমিজি’র ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন। গ্রন্থটির নাম ‘কিফায়াতুল মুগতাজি ফি শরহি জামিয়িত তিরমিজি’।

ব্যাখ্যাগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে রুচিশীল ও সমাদৃত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশ থেকে। চলতি বছরেই দীর্ঘ গবেষণা ও রচনাকাজের পর গ্রন্থটির পূর্ণতা আসে।

গত ৫ আগস্ট ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গ্রন্থটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠানে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মাওলানা আবুল কাসেম নোমানি এবং জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা আবদুল মালেকসহ দেশ-বিদেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও আধুনিক গবেষণার সমন্বয়ে রচিত এই ব্যাখ্যাগ্রন্থকে আরব বিশ্বসহ আন্তর্জাতিক হাদিস গবেষকদের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশ্বখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম ও শাইখুল হাদিস মাওলানা মুফতি আবুল কাসেম নুমানি বলেন, “ইমাম তিরমিজি তাঁর ‘জামে তিরমিজি’ গ্রন্থে শুধু হাদিস সংকলনই করেননি; বরং ফকিহদের মতপার্থক্য, দলিলের বিশ্লেষণ এবং ফিকহি আলোচনাকেও অনন্যভাবে উপস্থাপন করেছেন। মাওলানা আব্দুল মতিন দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে সেই ঐতিহ্যকে আরো সমৃদ্ধ করেছেন। প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং আধুনিক গবেষণাপদ্ধতির সমন্বয়ে তিনি একটি উচ্চমানের ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করতে সক্ষম হয়েছেন।”

সভাপতির বক্তব্যে শায়খুল হাদিস মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কিফায়াতুল মুগতাজি শুধু একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ নয়; এটি হাদিস পাঠদান, গবেষণা এবং দরস পরিচালনার একটি পূর্ণাঙ্গ মডেল।’ তাঁর মতে, এই গ্রন্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের তরুণ আলেমদের সামনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব, বিশিষ্ট হাদিস বিশারদ, গবেষক ও ফকিহ মাওলানা আবদুল মালেক বলেন, ‘তিরমিজি শরিফের বহু ব্যাখ্যাগ্রন্থ ইতিহাসের নানা পর্যায়ে অসম্পূর্ণ অবস্থায় থেকে গেছে। কিন্তু ‘কিফায়াতুল মুগতাজি’ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি হাদিসের ধারাবাহিক ও বিশ্লেষণধর্মী ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে। একই সঙ্গে এতে সালাফে সালেহিনের মানহাজ, মতভিন্নতার শিষ্টাচার এবং গবেষণার ভারসাম্য অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।’

তিনি মনে করেন, এই গ্রন্থ হাদিস গবেষণার দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা পূরণ করবে।

‘কিফায়াতুল মুগতাজি’র প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশের পরিচালক মাওলানা তাহমিদুল মাওলা বলেন, ‘গ্রন্থটির প্রথম চার খণ্ড প্রকাশের পরই দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা-মান বজায় রেখে আরব বিশ্বের আদলে ১৭ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছে।’

দীর্ঘ ২৫ বছরের গবেষণা, প্রাচীন পাণ্ডুলিপির ব্যবহার এবং আধুনিক গবেষণাপদ্ধতির সমন্বয়ে ‘কিফায়াতুল মুগতাজি ফি শরহি জামিয়িত তিরমিজি’ তাই শুধু বাংলাদেশের হাদিসচর্চায় নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে সামনে এসেছে।