ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় ব্রিটেনের অর্থনীতিতে গতি কমেছে, বাড়ছে চাপ

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর প্রভাব এবার স্পষ্ট হয়েছে ব্রিটেনের ব্যবসা-বাণিজ্যেও। যুদ্ধের প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্মিলিত চাপে এপ্রিল মাসে দেশটির অর্থনীতির গতি আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে। বৃহস্পতিবার দেশটির অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকসের (ওএনএস) প্রকাশিত তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে।

ওএনএস জানিয়েছে, এপ্রিল মাসে ব্রিটেনের অর্থনীতির গতি ০.১ শতাংশ কমেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ব্যয় বৃদ্ধি এবং টার্নওভারে প্রভাব পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। গত বছরের আগস্টের পর এটিই অর্থনীতির প্রথম মাসিক পতন। যদিও চলতি বছরের মার্চে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, বছরের শুরুতে অর্থনীতি তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও আগামী কয়েক মাসে এর গতি মন্থর হতে শুরু করেছে। তবে আগামী সপ্তাহে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের বৈঠকে সুদহার অপরিবর্তিত থাকতে পারে বলে তারা আশা করছেন।

ওএনএস জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তিন মাসের হিসাবে অর্থনীতির পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। আগের তিন মাসের তুলনায় এ সময়ে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ০.৭ শতাংশ বেড়েছে। তবে যুদ্ধের প্রভাবে প্রশাসন ও সহায়তা পরিষেবা, শিল্পকলা, বিনোদন ও অবকাশযাপন খাতে এপ্রিল মাসে প্রবৃদ্ধি ০.২ শতাংশ কমেছে।

সংস্থাটির এক কর্মকর্তা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজন বাতিল হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতির মুখে পড়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাহরাইন ও সৌদি আরবে অনুষ্ঠেয় ‘ফর্মুলা ওয়ান গ্র্যান্ড প্রি রেস’ বাতিল করা হয়। এ ছাড়া টেনিস ও ফুটবলের বেশ কিছু আয়োজনও বাতিল হয়েছে।

কর ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আরএসএমের প্রধান অর্থনীতিবিদ টমাস পুঘের মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানি বাজারেও যুদ্ধের প্রভাব

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অপরিশোধিত তেলের বাজারে। ফলে বিশ্বজুড়ে দ্রুত বেড়ে যায় তেলের দাম। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়। পরে যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে তেলের দাম আবার কমতে শুরু করে।

তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ বাজারেও। বেড়েছে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম। জুলাইয়ে জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবারগুলোর ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে আগামী মাস থেকে গ্রাহকদের আরও বেশি অর্থ গুনতে হতে পারে। শুধু জ্বালানি নয়, বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবার খরচের ওপরও তেলের দামের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে।

কেপিএমজি ইউকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইয়েল সেলফিন বলেন, এপ্রিল পর্যন্ত তিন মাসে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি থাকলেও এপ্রিলের মন্থর গতি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক গতিপথের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দিচ্ছে। তার মতে, মাসিক এই পরিসংখ্যান ব্রিটেনের অর্থনীতিতে নতুন করে ভঙ্গুরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আগামী মাসগুলোতে ভোক্তা ও ব্যবসায়ী—উভয়ের ওপরই চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। তেলের দাম বাড়লে মানুষ জ্বালানি কেনার পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি অন্যান্য ব্যয় কমানোর দিকে বেশি মনোযোগী হবে। এর ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও চাপ তৈরি হতে পারে।

এদিকে ব্যয় বাড়ার কারণে ব্রিটেনের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও চাপের মধ্যে পড়েছে। পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের মুনাফার হার কমেছে। ফলে যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানি ও ভোক্তা ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; ধীরে ধীরে তা ব্যবসা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে।