আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে জেমসের পরিচয় ১৯৮০ সালের শুরুর দিকে। এরপর দীর্ঘ চার দশকের সম্পর্ক পেরিয়ে তাদের বন্ধুত্ব বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে হয়ে উঠেছিল এক অনন্য উদাহরণ। পেশাগতভাবে দুজনের মধ্যে ছিল সুস্থ প্রতিযোগিতা, কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কে ছিল গভীর ভালোবাসা ও পারস্পরিক নির্ভরতা। আইয়ুব বাচ্চুর প্রয়াণের খবরের পর একটি কনসার্টে জেমসের চোখের জলও দেখেছিল দেশবাসী।
পরে গণমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে জেমস বলেছিলেন, বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক এমন, যা ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে তারা একে অপরের পাশে থেকেছেন। তাদের মধ্যে ভালো গান তৈরির প্রতিযোগিতা থাকলেও কোনো ঈর্ষা ছিল না। যখনই দেখা হয়েছে, ভালোবাসায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছেন।
আইয়ুব বাচ্চু না থাকলেও বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে থেমে নেই জেমসের পথচলা। গিটার হাতে দেশ থেকে দেশান্তরে ছুটে বেড়াচ্ছেন ‘নগর বাউল’খ্যাত এই শিল্পী। এবারও গান নিয়ে ইউরোপ সফরে ব্যস্ত তিনি।
গেল জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ইউরোপ ট্যুর শুরু করেন জেমস। লন্ডনের কনসার্ট দিয়ে শুরু হয় তার এই সংগীত সফর। এরপর পর্তুগাল, সাইপ্রাস, রোম, ভেনিস ও সুইডেনে কনসার্ট করার সূচি রয়েছে। এবারের সফরের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ছিল পর্তুগালে তার প্রথম কনসার্ট। সেখানে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি সরাসরি জেমসের গান শোনার সুযোগ পেয়েছেন।
বাচ্চুর জন্মদিনেই রোমে জেমসের কনসার্ট
ইউরোপ সফরের অংশ হিসেবে এবার ইতালির রাজধানী রোমে এক যুগ পর গান পরিবেশন করতে যাচ্ছেন জেমস। আগামী ১৬ আগস্ট সেখানে তার কনসার্ট অনুষ্ঠিত হবে। আর এই দিনটিই আবার প্রয়াত গিটারিস্ট ও সংগীতশিল্পী :contentReference[oaicite:0]{index=0} (Ayub Bachchu)-এর জন্মদিন।
কনসার্টকে সামনে রেখে রোমের একটি অভিজাত হোটেলের হলরুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বন্ধুকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন জেমস। আইয়ুব বাচ্চুকে হারানোর পর নিজের ভেতরের শূন্যতার কথাও জানান তিনি। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি এই শিল্পী।
জেমস বলেন, তারা সব সময় একসঙ্গে কাজ করেছেন, তারা ছিলেন জোড়া। বাচ্চু চলে যাওয়ার পর তাকে খুব একা লাগে—এর বেশি বিষয় তিনি বলতে চান না।
বন্ধুর স্মৃতিচারণের পাশাপাশি বাংলা সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলেও প্রত্যাশা প্রকাশ করেন জেমস। এ সময় প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভালোবাসা, সমর্থন ও সহযোগিতার কথাও বিশেষভাবে তুলে ধরেন তিনি।
ইউরোপজুড়ে ধারাবাহিক কনসার্ট
জেমসের ইউরোপ সফর সম্পর্কে তার মুখপাত্র ও নগর বাউল ব্যান্ডের ব্যবস্থাপক রুবাইয়াৎ ঠাকুর রবিন জানান, লন্ডনে পারফর্ম করার পরপরই তারা পর্তুগালের উদ্দেশে রওনা হন। ২৬ জুলাই দেশটির রাজধানী লিসবনে কনসার্টে অংশ নেন জেমস। এরপর সাইপ্রাসে হয় আরেকটি আয়োজন। ৯ আগস্ট সেখানে কনসার্ট করার পর ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করেন তারা।
আগামী ১৬ আগস্ট ইতালির রোমে অনুষ্ঠিত হবে প্রথম কনসার্ট। এরপর দ্বিতীয় আয়োজন হবে জলের ওপর ভাসমান শহর ভেনিসে। ইতালি পর্ব শেষ করে ইউরোপ সফরের পর ৫ সেপ্টেম্বর সুইডেনে কনসার্ট করার কথা রয়েছে জেমসের।
সবগুলো কনসার্টের আয়োজন করছে স্থানীয় ইভেন্ট অর্গানাইজাররা। আয়োজকদের পক্ষ থেকে পাওয়া ইঙ্গিত অনুযায়ী, সফরে কনসার্টের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
রবিন বলেন, ইউরোপসহ বিশ্বের অন্যান্য মহাদেশেও ধারাবাহিক কনসার্ট করার অভিজ্ঞতা রয়েছে জেমসের। প্রতিটি সফরেই দেখা গেছে, শুরুতে নির্ধারিত সংখ্যার মধ্যে কনসার্ট সীমাবদ্ধ থাকেনি। দর্শক-শ্রোতাদের আগ্রহের কারণে পরে আয়োজনের সংখ্যা বাড়াতে হয়েছে।
সংগীতপ্রেমীদের ভালোবাসা ও আহ্বানে সাড়া দিয়েই জেমস দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে ছুটে যান। তাই কনসার্টের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে তিনি স্বাভাবিক হিসেবেই দেখেন বলে জানান রবিন।
এবার অস্ট্রেলিয়ায় রুপম ইসলামের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করবেন
ইউরোপ সফর শেষ হওয়ার পরপরই জেমস প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ওশেনিয়া মহাদেশের অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে রওনা হবেন। এর আগেও অস্ট্রেলিয়ায় কনসার্ট করেছেন তিনি। তবে এবার সেখানে তার সঙ্গে মঞ্চ ভাগাভাগি করবেন ভারতের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী :contentReference[oaicite:1]{index=1} (Rupam Islam) এবং তার রক ব্যান্ড ফসিলসের সদস্যরা।
এর আগেও একই মঞ্চে জেমস ও রুপম ইসলামকে দেখা গেছে। তাদের যৌথ পরিবেশনায় দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে। এবারও বাংলাদেশ ও ভারতের এই দুই রকশিল্পীকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় আয়োজিত ‘লাইভ ইন সিডনি’ কনসার্টকে ঘিরে সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে ইতোমধ্যেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিনে রোমের মঞ্চে জেমসের গান, আর একই সময়ে বন্ধুকে হারানোর শূন্যতার কথা বলা—দীর্ঘ চার দশকের সেই সম্পর্কের স্মৃতিকে যেন নতুন করে সামনে নিয়ে আসছে। অন্যদিকে এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটে চলা তার বর্তমান সংগীত সফরও দেখাচ্ছে, শ্রোতাদের ভালোবাসার টানেই এখনো একইভাবে মঞ্চে সক্রিয় রয়েছেন নগর বাউল।


