মাত্র তিন দিনের ছুটি নিয়ে সাড়ে তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমির প্রধান শিক্ষক মো. জিল্লুর রহমান। দীর্ঘ সময় ধরে প্রধান শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় বিদ্যালয়টির প্রশাসনিক কার্যক্রম ও পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে জিল্লুর রহমান সেই নিয়ম অনুসরণ না করেই বিদেশে গেছেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অঞ্জন দাশ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি দেন। সে সময় ইউএনও বিদ্যালয়টির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ২২ আগস্ট বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মাত্র তিন দিনের ছুটি নেন জিল্লুর রহমান। পরদিন ২৩ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন তিনি। এরপর আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসেননি। অর্থাৎ তিন দিনের ছুটি নিয়ে টানা সাড়ে তিন বছর ধরে তিনি বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছেন।
তবে এর আগেও বিদেশে যাওয়ার নজির রয়েছে জিল্লুর রহমানের। ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রে যান তিনি। প্রায় পাঁচ মাস চার দিন পর দেশে ফেরেন। সে সময় বিদ্যালয় থেকে দুই মাসের ছুটি নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেননি। দেশে ফেরার পর তিনি সরকারি বেতন-ভাতাও উত্তোলন করেন বলে জানিয়েছে বিদ্যালয় সূত্র।
রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি ২০১৭ সালের ১৯ মার্চ জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় প্রধান শিক্ষকের দীর্ঘ অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও একাডেমিক পরিবেশে প্রভাব ফেলছে বলে শিক্ষক ও অভিভাবকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
কমছে ফলাফল, বাড়ছে অভিভাবকদের হতাশা
অভিভাবক জাকির হোসেন ও রাজিব হোসেন জানান, চার-পাঁচ বছর আগেও এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির ফলাফল ভালো ছিল। সে সময় সন্তানকে এই বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে আগ্রহ ও প্রতিযোগিতা ছিল। কিন্তু কয়েক বছর ধরে আশানুরূপ ফলাফল হচ্ছে না। এর ফলে বিদ্যালয়টির শিক্ষার মান ও সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
বিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষক জানান, প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নানা সংকট তৈরি হয়েছে। তার নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রধান শিক্ষক নিজেই নিয়মনীতি না মানায় অন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যেও দায়িত্ব পালনে অনীহা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
তাদের মতে, একজন প্রতিষ্ঠানের প্রধানের এভাবে দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিতি কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানের জন্য মঙ্গলজনক নয়। এতে শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রমই নয়, প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও শিক্ষার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোস্তফা ফারুকী বলেন, ‘আমরা প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। তিনি কবে প্রতিষ্ঠানে যোগ দেবেন, সেটিও নিশ্চিতভাবে জানাননি। ফলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে এখনো তাঁর পদটি শূন্য ঘোষণা করা হয়নি।’
যোগাযোগের চেষ্টা, মেলেনি সাড়া
অভিযোগের বিষয়ে মো. জিল্লুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারের মাধ্যমেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউসার বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ যেতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু জিল্লুর রহমান বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অনুমতি নেননি।
তিনি জানান, বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন ইউএনও।
ফলে তিন দিনের ছুটি নিয়ে সাড়ে তিন বছর ধরে বিদেশে অবস্থান করা প্রধান শিক্ষক জিল্লুর রহমানের বিষয়ে প্রশাসনিকভাবে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকহীন অবস্থায় থাকা রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমির শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কবে স্বাভাবিক হয়, তা নিয়েও অপেক্ষায় রয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।

