দেশের নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাত্রা নিশ্চিত করতে ঢাকাসহ তিন শহরে বিআরটিসির ‘পিংক বাস’ সেবা চালু হয়েছে। ১৩টি রুটে মোট ১৪টি বাস নিয়ে শুরু হওয়া এই সেবার মধ্যে রাজধানী ঢাকায় চলবে ১০টি, চট্টগ্রামে ২টি এবং বগুড়ায় ২টি বাস।
গতকাল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসি ঢাকা ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে মহিলা বাস সার্ভিস বা পিংক বাসের উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। নতুন এই বাসসেবা চালুর ফলে গণপরিবহনে নারীদের হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমবে বলে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন পেশার নারীরা। তবে কেউ কেউ মনে করছেন, নারীদের নিরাপত্তার জন্য শুধু আলাদা বাস চালু করাই যথেষ্ট নয়; গণপরিবহনের সর্বত্রই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পিংক বাসের চালক, কন্ডাক্টর ও সহকারী—সবাই নারী। মহিলা বাস সার্ভিসে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা ডিপো, বাস ও কাউন্টারের দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শনের পাশাপাশি ই-টিকিটিং ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।
সম্প্রতি বিআরটিসি ও ‘সহজ’ ডটকমের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় নির্ধারিত মহিলা বাস সার্ভিসে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা। এর ফলে বাসে ওঠার আগে টিকিট সংগ্রহের প্রক্রিয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় ও কাউন্টারনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে তিনটি বাসে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা এবং একটি বাসে ওয়াই-ফাই সুবিধা চালু করা হয়েছে। প্রতিটি বাসে ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) সংযোজন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব প্রযুক্তি সব বাসে সম্প্রসারণ করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
‘সব কাজ সবার জন্য’
পিংক বাসের চালক মোসাম্মৎ রাবেয়া খাতুন বলেন, তিনি বিআরটিসিতে ছোট বাহন চালনার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি নারী বাসের চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এমএ পাস করা রাবেয়া খাতুনের পরিবারে মা-বাবা, স্বামী ও শিশুসন্তান রয়েছেন।
তিনি জানান, বাস চালাবেন—এ কথা জানার পর পরিবারের পক্ষ থেকে আপত্তি উঠেছিল। তবে তার বিশ্বাস, সব কাজ সবার জন্য। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন।
রাজধানীতে যেসব রুটে চলবে পিংক বাস
বিআরটিসির পিংক বাস রাজধানীর নতুন বাজার (কোকাকোলা)-মতিঝিল, তালতলা-সচিবালয়, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার-মৎস্য ভবন, মিরপুর-মতিঝিল, নারায়ণগঞ্জ-মতিঝিল, আব্দুল্লাহপুর-মতিঝিল, মোহাম্মদপুর-কমলাপুর এবং গাজীপুর-বিমানবন্দর রুটে চলাচল করবে।
বগুড়ায় বাস চলবে শেরপুর-আরডিএ স্কুল, নয়মাইল মোড়, শাঃ উপঃ গেট, বি-ব্লক-মাঝিরা, বনানী, সাতমাথা, মহিলা কলেজ, মাটিডালি; বনানী-সাতমাথা, মহিলা কলেজ, মাটিডালি মোড়, টিএমএসএস হাসপাতাল, মহাস্থান বাজার ও মোকামতলা স্ট্যান্ড রুটে।
চট্টগ্রামে পিংক বাস চলবে কালুরঘাট-কাপ্তাই রাস্তার মাথা, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, জিইসি মোড়, লালখান বাজার, টাইগারপাস, দেওয়ানহাট, চৌমুহনী, আগ্রাবাদ, বারেক বিল্ডিং, ফ্রিপোর্ট, কাঠগড় ও পতেঙ্গা রুটে।
গণপরিবহনে নারীদের হয়রানির চিত্র
বিভিন্ন সময়ে সরকারি-বেসরকারি জরিপে গণপরিবহনে নারীদের যৌন হয়রানিসহ নানা ধরনের হয়রানির উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গত বছর ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) কার্যালয়ে আয়োজিত ‘গণপরিবহনে নারীর সম্মান রাখুন’ ক্যাম্পেইন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দেশে গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৮৭ শতাংশ নারী মৌখিক, শারীরিক ও অন্যান্যভাবে হয়রানির শিকার হন। তাদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ যৌন হয়রানির শিকার হন। সচেতনতামূলক নাটিকার মাধ্যমে অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
এর আগে প্রকাশিত ব্র্যাকের একটি গবেষণাতেও গণপরিবহনে নারীদের হয়রানির উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে। ওই গবেষণা অনুযায়ী, গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হন। এসব হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বেশির ভাগই মাঝবয়সী বা তার বেশি বয়সী পুরুষ।
গবেষণায় উঠে আসা হয়রানির ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে স্পর্শ করা, চিমটি কাটা, শরীর ঘেঁষে দাঁড়ানো, আস্তে আস্তে ধাক্কা দেওয়া, স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দেওয়া, গায়ের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে ঘুমিয়ে পড়া এবং কাঁধে হাত দেওয়া।
বিভিন্ন পেশার নারীরা বলছেন, দেশের পাবলিক প্লেসে নারীদের যৌন হয়রানির মতো ঘটনা প্রতিদিনই ঘটে। এর পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতার দিক থেকেও অনেক নারী গণপরিবহনের ভিড়ে সমস্যায় পড়েন। একজন পুরুষ যাত্রী ভিড় ঠেলে যতটা সহজে চলাচল করতে পারেন, নারীদের ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতায় বিআরটিসির পিংক বাস চালুর বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেক নারী।
মিরপুর এলাকার বাসিন্দা তাসমিয়া আমিন বলেন, পিংক বাসের উদ্দেশ্য নারীদের স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা ও যাতায়াত সহজ করা। প্রাথমিকভাবে নারী বাসযাত্রী হিসেবে তিনি এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান। এই সার্ভিসের চালক ও কন্ডাক্টর নারীরা হওয়াকেও তিনি স্বস্তিদায়ক বলে মনে করেন।
তার ভাষায়, দেশের বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নারী। ব্যস্ত সময়ে বাসে চলাচল করা কিংবা নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে রাতে বাসে বাড়ি ফেরা—দুই ক্ষেত্রেই নারীদের জন্য এমন একটি বাসসেবা প্রয়োজন ছিল। তার মতে, বাসে বিভিন্ন অপরাধ, দুর্ঘটনা ও বিকৃত আচরণ থেকেও নারীরা কিছুটা মুক্তি পাবেন। পাশাপাশি নারীদের স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরার সুযোগ তৈরি হবে। পর্দানশীল নারীরাও এই সেবায় সন্তুষ্ট হবেন বলে মনে করেন তিনি।
তাসমিয়া আমিন আরও বলেন, এই উদ্যোগ নারীদের জন্য একটি নতুন কর্মক্ষেত্রও তৈরি করেছে। এখানে কাজ করা নারীরা নিজেদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে নিতে পারবেন।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থী রুকাইয়া রহমান দিনা বলেন, পিংক রঙের বাস নারীদের জন্য বেশ স্বস্তির। বিশেষ করে অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় বাসে অতিরিক্ত ভিড় ও পুরুষ যাত্রীদের কারণে অনেক নারী অস্বস্তিতে পড়েন। নারীদের জন্য আলাদা বাস থাকলে এসব সমস্যা কমে আসবে।
তার মতে, হয়রানি বা অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের ভয়ও কম থাকবে। ফলে অনেক নারী তুলনামূলক নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারবেন। তবে এর পাশাপাশি বাসের সংখ্যা বাড়ানো, নিয়মিত চলাচল নিশ্চিত করা এবং নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাহলেই পিংক বাস নারীদের জন্য সত্যিকার অর্থে স্বস্তিদায়ক ও কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে।
সামনে আরও ১০০ ইলেকট্রিক বাস
বাস উদ্বোধন শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, নারী যাত্রীদের জন্য ১০০টি পিংক কালারের ইলেকট্রিক বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে ৫০টি এবং পর্যায়ক্রমে ১০০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নারী যাত্রীদের জন্য বিশেষ সেবা দ্রুত চালুর লক্ষ্যে বিদ্যমান সম্পদ ব্যবহার করে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার মধ্যেই সীমিত পরিসরে পিংক বাস সার্ভিস চালু করেছে বিআরটিসি।

