কথা ছিল নতুন জামা, চকোলেট আর খেলনা নিয়ে বাবা-মা ও ছোট্ট ভাই ফিরবেন। মঙ্গলবার রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভিডিওকলে দেশে রেখে যাওয়া সাত বছরের কন্যা মহিমাকেও সেই কেনাকাটা দেখিয়েছিলেন বাবা দেবাশীষ দত্ত। বলেছিলেন, বুধবারই ফিরবেন। কিন্তু কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে ভয়াবহ অ’গ্নি সেই প্রতীক্ষাকে মুহূর্তেই বদলে দিয়েছে শোকে। চকোলেট আর খেলনার বদলে এখন মহিমার অপেক্ষা বাবা-মা ও ছোট ভাইয়ের মরদেহের জন্য।
কুষ্টিয়া শহরের আরওয়াপাড়ার ভাড়া বাসায় দেয়ালে টাঙানো বাবা-মায়ের ছবির দিকে নির্বাক তাকিয়ে আছে ছোট্ট মহিমা। পাশেই স্বজনরা ঘিরে রেখেছেন তাকে। অন্যদিকে একমাত্র পুত্র, পুত্রবধূ ও নাতির ছবি বুকে জড়িয়ে বিলাপ করছেন মা স্বপ্না দত্ত। শোকে স্তব্ধ বাবা দিলীপ কুমার দত্ত। আত্মীয়স্বজন বারবার সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও সন্তানের হারানোর এই শোক থামেনি।
কলকাতার হোটেলের অ’গ্নি কেড়ে নিয়েছে দেবাশীষ, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমিন, তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশীষ দত্ত এবং বেয়াই আকরাম আলীর প্রাণ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন দেবাশীষ। তাই স্বজনদের সামনে এখন শুধু শোক নয়, ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় অনিশ্চয়তা। কে কিনে দেবে বাবা-মায়ের ওষুধ, কে দেবে বাসাভাড়া, কে দেখবে মহিমাকে—এসব প্রশ্ন করতে করতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন মা স্বপ্না।
বুধবার বিকালে কুষ্টিয়া শহরের আরওয়াপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, বাসাটির সামনে শত শত মানুষের ভিড়। ভেতর থেকে ভেসে আসছিল আহাজারির শব্দ। ঘরে ঢুকতেই দেখা যায়, কয়েকজন সহপাঠী ছোট্ট মহিমাকে ঘিরে বসে আছে। দেয়ালে টাঙানো বাবা-মায়ের ছবির দিকে সে অপলক তাকিয়ে আছে। তার জীবনে কী ভয়াবহ পরিবর্তন নেমে এসেছে, সেই সত্য হয়তো এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি শিশুটি।
মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে বাবা-মায়ের সঙ্গে ভিডিওকলে শেষ কথা হয়েছিল মহিমার। বাবা তাঁর পছন্দের জামা ও চকোলেট কেনার কথা দেখিয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন, বুধবার দেশে ফিরবেন। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না।
সাংবাদিক দেবাশীষের মৃত্যুতে কুষ্টিয়ায় শোক
নিহত দেবাশীষ দত্ত আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া প্রতিনিধি এবং চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি স্থানীয় দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন তিনি। এর আগে এশিয়ান টেলিভিশন, নাগরিক টিভিসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন।
কুষ্টিয়া শহরে সৎ ও মেধাবী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন দেবাশীষ। বুধবার সকালে কলকাতার হোটেল অ’গ্নিতে তাঁর মৃ’ত্যুর খবর কুষ্টিয়ায় পৌঁছালে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে শোক নেমে আসে। সহকর্মীরা ছুটে যান তাঁর বাসায়। অনেকেই দেবাশীষের সঙ্গে কাটানো সময় ও স্মৃতির কথা মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
স্ত্রী-পুত্রের চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন
দেবাশীষের স্ত্রী শারমিনের রক্তের কণিকা ভেঙে যাওয়ার সমস্যা ছিল। তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশীষের কণ্ঠেও ছিল জড়তা। এ ছাড়া শ্বশুর আকরাম হোসেনও বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। স্ত্রী, সন্তান ও শ্বশুরের উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৩ আগস্ট ভারতে যান দেবাশীষ।
সাত বছরের কন্যা মহিমাকে দেশে বাবা-মায়ের কাছে রেখে তিনি প্রথমে বেঙ্গালুরু যান। সেখানে নারায়ণা হাসপাতালে পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা করান। দীর্ঘ ১৬ দিন বেঙ্গালুরুতে অবস্থানের পর গত ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার কলকাতায় ফেরেন তাঁরা। ওঠেন মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে।
সেদিনই দেশে ফেরার কথা ছিল দেবাশীষের। কিন্তু দেশে রেখে যাওয়া একমাত্র মেয়ের জন্য কেনাকাটা করতে তিনি আরও একদিন কলকাতায় থাকার সিদ্ধান্ত নেন। সেই একদিনই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়।
যেভাবে অ’গ্নির সূত্রপাত
রাতে কেনাকাটা ও খাওয়া-দাওয়া শেষে হোটেলের কক্ষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন দেবাশীষ। গভীর রাতে হঠাৎ ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায় পুরো হোটেল। তখন পরিবার নিয়ে গভীর ঘুমে ছিলেন তিনি।
কলকাতা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে রাত ২টার দিকে অ’গ্নিকাণ্ড ঘটে। হোটেলের চতুর্থ তলায় অ’গ্নির সূত্রপাত হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হোটেলের একটি এয়ার কন্ডিশনার বিস্ফোরণের পর অ’গ্নি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর কালো ধোঁয়া দ্রুত পুরো হোটেলকে ঘিরে ফেলে।
এই ঘটনায় মোট ৯ জনের মৃ’ত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পাঁচ বাংলাদেশির পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে সাংবাদিক দেবাশীষসহ তাঁর পরিবারের চার সদস্য রয়েছেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়েই তাঁদের মৃ’ত্যু হয়েছে।
কলকাতা পুলিশ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, অ’গ্নির খবর পাওয়ার পর হোটেল থেকে ৬০ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৯ জন অচেতন ছিলেন। তাদের মধ্যে দুই নারী ও একটি শিশু ছিল। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাদের মৃ’ত ঘোষণা করেন।
এদিকে পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দেবাশীষসহ নিহত পরিবারের সদস্যদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার তাঁদের মরদেহ দেশে আনার কথা রয়েছে।
ভালোবেসে আফসানাকে বিয়ে করেছিলেন দেবাশীষ
দেবাশীষ দত্ত ও আফসানার ভালোবাসার গল্প ছিল অনেকটা স্বপ্নের মতো। দীর্ঘদিন একে অপরকে ভালোবেসে প্রায় নয় বছর আগে তাঁরা সংসার শুরু করেন। দুজনের ধর্ম আলাদা হলেও ভালোবাসার পথে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
ভালোবাসায় গড়া সেই সংসারে এসেছিল দুই সন্তান—একমাত্র ছেলে স্বর্ণশীষ দত্ত ও মেয়ে মহিমা দত্ত। সন্তানদের ঘিরেই ছিল তাঁদের ছোট্ট পৃথিবী, ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে অসংখ্য স্বপ্ন। কিন্তু কলকাতার ভয়াবহ অ’গ্নি মুহূর্তেই সেই সংসারকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।
বাবা-মা ও ছোট ভাইকে হারিয়ে মাত্র সাত বছরের মহিমা এখন যেন পাথর হয়ে গেছে। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাবা-মায়ের ছবির দিকে। ছবিতে থাকা মানুষগুলো আর কোনোদিন ফিরে আসবে না—এই নির্মম সত্যটি হয়তো এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি ছোট্ট মেয়েটি।
‘আমাদের এখন কে দেখবে’
দেবাশীষ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। নিজেদের ভিটেমাটি না থাকায় বাবা-মা ও পরিবার নিয়ে কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।
দেবাশীষের বাবা দিলীপ কুমার দত্ত মানবজমিনকে বলেন, তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত। তাঁর স্ত্রীও অসুস্থ এবং কয়েকদিন আগে স্ট্রোক করেছেন। প্রতি মাসে তাঁদের ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। বাসাভাড়া, পরিবারের ভরণপোষণ এবং বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ—সবই দেবাশীষ বহন করতেন।
এখন সেই মানুষটিই নেই।
শোকাহত বাবা প্রশ্ন রাখেন, এখন তাঁদের দেখবে কে? বাসাভাড়ার টাকা দেবে কে, ওষুধের খরচ বহন করবে কে? নাতনি মহিমার দেখাশোনা ও পড়ালেখার দায়িত্বই বা কে নেবে?
একসঙ্গে ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতিকে হারিয়ে তিনি বলেন, তিনি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। আর সেই শোকের মাঝেই কুষ্টিয়ার একটি ঘরে বসে বাবা-মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে আছে ছোট্ট মহিমা—যে এখনো হয়তো অপেক্ষা করছে, বাবা দরজা খুলে নতুন জামা, চকোলেট আর খেলনা নিয়ে ঘরে ঢুকবেন।

