তিস্তায় ভয়াবহ ভাঙন, ৭২ ঘণ্টায় নদীগর্ভে ৮৩ বসতভিটা

ভয়াল রূপ নিয়েছে তিস্তা নদী। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়ন অংশে গত ৭২ ঘণ্টায় নদীভাঙনে অন্তত ৮৩টি বসতভিটা বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা আরও দুই শতাধিক পরিবার এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

সরেজমিনে ভাঙনকবলিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো কয়েকটি পরিবার নদীর তীরে খোলা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে অস্থায়ী চুলায় চলছে রান্নাবান্না। কেউ কেউ আবার উঁচু বাঁধ কিংবা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে কোনোভাবে দিন পার করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চলতি বছর কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি চরে ইতোমধ্যে পঞ্চম দফায় ভাঙন শুরু হয়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করে চরের উত্তর অংশে ভাঙন দেখা দেয়। এরপর মাত্র এক রাতেই ৬০টি বসতভিটা তিস্তায় বিলীন হয়ে যায়। এর মধ্যে ১২ পরিবারের সাতটি টিনের ঘরও পুরোপুরি নদীতে ভেসে গেছে।

ভোরের পাখি চরের সিংগীজানী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, ‘ঘর তোলার শেষ সম্বলটুকুও গেল নদীত। দুই বছরে ছয়বার নদী ভাঙার পর এই জায়গাত কোনো মতে মাথা গুঁজে আছনু। সেটাও আজ চলি গেল। হ্যামার ঘরে দুঃখ দেখার মতো কেউ নাই। চোখের সামনত ঘর দুইটা নদীত চলি গেল, কিছুই করবার পানু না।’

ভাঙন নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গ্রামের বাসিন্দা আতোয়ার রহমান। তিনি বলেন, ‘বাড়িঘর ভাঙতে শুরু করলেই কেবল পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঘুম ভাঙে। ভাঙন থামলে তারা আবার ঘুমিয়ে পড়ে। বছরের পর বছর এই অবহেলা চলছে।’

কাপাসিয়া ইউনিয়নের সদস্য হাফিজুল ইসলাম বলেন, বর্ষার শুরু থেকেই ওই এলাকায় ভাঙন চলছে। গত বুধবার রাত ৩টার দিকে ভাঙন হঠাৎ তীব্র আকার ধারণ করে। এতে বসতভিটা, গাছপালা ও খোঁয়াড়ের পাশাপাশি হাঁস-মুরগিও নদীতে ভেসে গেছে।

এর আগে গত ১৮ আগস্ট তিস্তার ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় চরের শিশুদের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তারও আগে গত ১৬ জুলাই দুপুরে সেখানে আকস্মিক ভাঙন দেখা দিয়েছিল। ওই দিন অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় ১০০ পরিবারের বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙনের খবর পাওয়ার পর ইউএনও, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। গত ৮ আগস্ট পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদও এলাকা পরিদর্শনে আসেন। সে সময় বিদ্যালয়টিসহ ভাঙনকবলিত এলাকার বসতিগুলো রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তালিকা পাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।

পাউবো গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, ওই এলাকায় ভাঙনের খবর পাওয়ার পরই জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু করা হয়েছে।