বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর কাশী ও মথুরার ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের দাবির মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে মথুরা। অযোধ্যা ও কাশীর আদলে মথুরা-বৃন্দাবনেও বিশাল মন্দির চত্বর গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ।
শুক্রবার মথুরার শ্রীকৃষ্ণ জন্মভূমি মন্দিরে পূজা দেওয়ার পর এই ঘোষণা দেন তিনি। আসন্ন উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রীর এমন ঘোষণাকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যোগী আদিত্যনাথ বলেন, অযোধ্যা ধামে বিশ্বের বৃহত্তম মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। এবার একই ধরনের বিশাল পরিকাঠামো মথুরা-বৃন্দাবনেও গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। এর মাধ্যমে ব্রজভূমির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আরও সুদৃঢ় করা হবে বলে জানান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ‘কাশী-মথুরা’ ইস্যু আবারও সামনে এসেছে। ‘বাবরি পহেলা ঝাঁকি হ্যায়, কাশী-মথুরা বাকি হ্যায়’—করসেবক ও সংঘ পরিবারের ব্যবহৃত এই স্লোগানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। হিন্দুত্ববাদীদের একাংশ কাশীর জ্ঞানভাপী এবং মথুরার শাহী ঈদগাহ মসজিদকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে। এসব স্থাপনা ভেঙে সেখানে ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের দাবিও রয়েছে।
তবে শুক্রবারের বক্তব্যে যোগী আদিত্যনাথ সরাসরি কোনো স্থাপনা ভেঙে ফেলার কথা বলেননি। তিনি মথুরা-বৃন্দাবনে একটি বিশাল মন্দির চত্বর গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাই জানিয়েছেন। অযোধ্যা ও কাশীর উন্নয়নের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি ব্রজভূমির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
এদিন সনাতন ধর্মের সহনশীলতা নিয়েও বক্তব্য দেন যোগী। তাঁর ভাষ্য, অতীতে ভারতের ওপর বহুবার বিদেশি আক্রমণ হয়েছে। জোর করে অন্য ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছে। কিন্তু কেউ সনাতন ধর্মকে মুছে ফেলতে পারেনি।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রায় ৫ হাজার বছর আগের বাণী আজও প্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ সময় ‘পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম’ শ্লোকটিও স্মরণ করেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী।
যোগী বলেন, যেখানেই শুভ শক্তি রয়েছে, তা সব সময় সুরক্ষিত থাকবে। একই সঙ্গে দেশের ঐক্য, অখণ্ডতা ও বিশ্বাসের ক্ষতি করতে চায় এবং সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে—এমন দেশবিরোধী ও সমাজবিরোধী শক্তিকেও কড়া বার্তা দেন তিনি।
মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনার পাশাপাশি ব্রজভূমির সার্বিক উন্নয়নেও একাধিক অবকাঠামোগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে মুখ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে উত্তরপ্রদেশ ব্রজ তীর্থ বিকাশ পরিষদের নবম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকে মথুরা ও বৃন্দাবনের মধ্যকার ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওই পথে রেলবাস পরিষেবা বন্ধ করে সেখানে একটি সড়ক নির্মাণ করা হবে।
পরিষদের সিইও লক্ষ্মী নাগাপ্পান জানান, সংস্কৃতি দপ্তরের ‘স্মারক মিত্র’ প্রকল্পের আদলে ব্রজ অঞ্চলে ‘তীর্থ মিত্র’ নামে একটি নতুন প্রকল্প চালু করা হচ্ছে। এর আওতায় গুরুত্বপূর্ণ, অথচ বর্তমানে ভগ্নপ্রায় ২০০টি ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য ও স্মৃতিসৌধ চিহ্নিত করা হবে। পরবর্তী সময়ে এসব স্থাপনা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ব্রজ অঞ্চলে বাড়তে থাকা তীর্থযাত্রীর ভিড় বিবেচনায় নিয়ে ব্রজ চৌরাশি ক্রোশ পরিক্রমা উন্নয়ন প্রকল্প আগামী তিন বছরের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন যোগী। একই সঙ্গে ব্রজ অঞ্চলের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও সাহিত্য সংরক্ষণের কথাও বলা হয়েছে।
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) অথবা রাজস্ব ভাগাভাগি মডেলে বহুতল পার্কিং নির্মাণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এসব পার্কিং এলাকায় ডরমিটরি, ক্যাফে ও ফুড কোর্ট রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
গোবর্ধন পরিক্রমা পথে পুণ্যার্থীদের চলাচলের সুবিধার জন্য ১০টি গল্ফ কার্ট দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে হায়দরাবাদের হার্টফুলনেস ফাউন্ডেশন। পাশাপাশি পরিক্রমার পথগুলো আরও মসৃণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্ষার সময়ে যাতে পথ পিচ্ছিল না হয় এবং ভক্তদের পায়ে আঘাত না লাগে, তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
মথুরার নোনা জলের সমস্যা সমাধানে জল সংরক্ষণের ওপরও জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বাড়াতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং আরও পুকুর খননের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
উৎসবের মৌসুমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সময় পুলিশি টহল বাড়ানো হবে এবং ইন্টিগ্রেটেড কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হবে।
শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে দুই দফায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর সিদ্ধান্তও হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে আবর্জনা সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


