দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জ ফকল্যান্ডের মালিকানা ফিরে পেতে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে আর্জেন্টিনা। দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন, দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ফকল্যান্ডের সমুদ্রসীমায় তেল উত্তোলনের চেষ্টা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন তিনি।
১৯৮২ সালের যুদ্ধে পরাজয়ের চার দশকেরও বেশি সময় পর আর্জেন্টিনার এই নতুন করে সরব হয়ে ওঠা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো এই বিরোধে এবার নতুন মাত্রা যোগ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্য।
সম্প্রতি ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ফকল্যান্ডের ওপর যুক্তরাজ্যের একক অধিকার মেনে নেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতি তিনি পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে লন্ডন ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যখন টানাপোড়েন চলছে, ঠিক সেই সময় ট্রাম্পের এমন বার্তা সামনে এলো।
যুক্তরাষ্ট্র যদি ঐতিহাসিক মিত্র যুক্তরাজ্যের পরিবর্তে ফকল্যান্ড প্রশ্নে আর্জেন্টিনার অবস্থানকে সমর্থন করে, তাহলে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
তেলের কারণে বিরোধে যুক্ত ইসরাইলও
ফকল্যান্ডকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনায় এবার ইসরাইলের নামও সামনে এসেছে। দ্বীপপুঞ্জের উপকূলের ‘সি লায়ন’ নামের একটি বিশাল তেলক্ষেত্র থেকে প্রায় ২৩ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলনের কাজ করছে একটি ব্রিটিশ-ইসরাইলি কোম্পানি। ওই কোম্পানিতে ইসরাইলের ‘নাভিতাস পেট্রোলিয়াম’-এর বড় শেয়ার রয়েছে।
আর্জেন্টিনা এই তেল উত্তোলনের ঘটনায় তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। একই সঙ্গে ওই ইসরাইলি কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে দেশটি।
তবে ইতিহাসের একটি বিষয় এখানে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় ইসরাইলই আবার লন্ডনের অবস্থানকে উপেক্ষা করে গোপনে আর্জেন্টিনার কাছে যুদ্ধবিমান ও অস্ত্র বিক্রি করেছিল।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ফকল্যান্ড?
দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে সাড়ে তিন হাজারের মতো মানুষ বসবাস করেন। তাদের প্রায় সবাই ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত। ১৮৩৩ সাল থেকে এলাকাটি ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা হঠাৎ দ্বীপপুঞ্জটি দখল করে নিলে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। যুদ্ধে জয়ী হয়ে ব্রিটেন আবারও দ্বীপপুঞ্জটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
এরপর ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত গণভোটে ফকল্যান্ডের ৯৯.৮ শতাংশ মানুষ ব্রিটেনের সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দেন। ফলে দ্বীপটির বাসিন্দাদের বড় অংশের অবস্থানও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কিন্তু পরিস্থিতিতে নতুন হিসাব যোগ করেছে সমুদ্রের বিপুল খনিজ তেলের সম্ভাবনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা। বিশেষ করে ট্রাম্পের সম্ভাব্য সমর্থন পাওয়ার আশায় আর্জেন্টিনা আবারও ফকল্যান্ডের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার দাবিতে জোরালোভাবে মাঠে নেমেছে।
দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় পর পুরোনো এই বিরোধে তেল, ভূরাজনীতি, যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক এবং আর্জেন্টিনার জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন একসঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় ফকল্যান্ড ইস্যু আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
সূত্র: মিডলইস্ট আই।
“`


